ভারতের পক্ষ থেকে একটানা চাপের মুখে ট্রানজিট পণ্য পরিবহণে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করার সুযোগ দিতে দেশটির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

গত বুধবার (৭ ডিসেম্বর) দুই দেশের নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠকে এ বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে কিছু কিছু বিষয়ে এখনো দুই পক্ষের মধ্যে মতের ব্যবধান রয়ে গেছে। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন নৌ পরিবহণ সচিব অশোক মাধব রায়। আর ভারতের পক্ষে ছিলেন সেদেশের নৌসচিব রাজিব কুমার।

বৈঠক সূত্র থেকে জানা গেছে, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে ভারতীয় পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রশাসনিক ফি ছাড়া আর কোন শুল্ক বা কর আরোপ করতে পারবে না মর্মে ভারতের চুক্তির খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে। দুই বন্দরে পণ্য পরিবহণের জন্য অতিরিক্ত কোনো ফি ছাড়াই বিশেষ বা ডেডিকেটেড স্থান বরাদ্দ দিতে হবে ভারতকে যেটি আর কোনো দেশ ব্যবহার করতে পারবে না। এছাড়াও ভারতীয় প্রস্তাবে সে দেশের পণ্যবাহী জাহাজকে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রথম অগ্রাধিকার দিয়ে প্রবেশের ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়েছে।

ডেডিকেটেড স্থান বরাদ্দ নিয়ে স্থানীয় শিপিং কর্মকর্তারা এখনো সম্মত হয়নি বলে জানা গেছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন, ভারতীয় দাবি অনুসারে তাদের জাহাজকে ‘অগ্রাধিকার’ দেয়া হলে একই সুবিধা অন্য দেশের পক্ষ থেকে দাবি করা হতে পারে। এছাড়া ট্রানজিট পণ্যের বাড়তি চাপের কারণে সিলেটের তামাবিল ও শেউলা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ামুখি ট্রানজিট পয়েন্টে পণ্য পরিবহনের ফলে ইতিমধ্যে যানজট প্রবণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অবস্থা আরো খারাপ হতে পারে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
দেশের রপ্তানি ও আমদানির ৮০ শতাংশ পণ্য এখন আসা যাওয়া হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে, যার পরিমাণ ৫৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের । এর বেশিরভাগ দেশের লাইফলাইন হিসাবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে পরিবহণ হয়ে থাকে।

২০১১ সালে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত কোর কমিটি ভারতীয় পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে টন প্রতি ১ হাজার ৫৮ টাকা ট্রানজিট ফি নির্ধারণের সুপারিশ করেছিল। এই সুপারিশ শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি।

বাংলাদেশ এরমধ্যে আশুগঞ্জসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নদীবন্দর দিয়ে টন প্রতি ১৯২ টাকা ট্রানজিট ফি পরিশোধের শর্তে উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ট্রানজিট পণ্য নিয়ে যাবার জন্য ভারতকে অনুমতি দিয়েছে।

সচিব পর্যায়ের বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ট্রানজিটের পণ্য পরিবহণে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের শর্তের ব্যাপারে ভারতের অবস্থান ছিল খুবই অনঢ়। বাংলাদেশকে তারা এ ব্যাপারে সম্মত হতে চাপ দিয়ে আসছে।

ট্রানজিট ফি ছাড়া বন্দর ব্যবহার করতে দিয়ে বাংলাদেশ কিভাবে লাভবান হবে এ প্রসঙ্গে ভারতের পক্ষ থেকে যুক্তি দেখানো হয় যে, চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ভারতকে ব্যবহার করতে দিলে বাংলাদেশ দুইভাবে লাভবান হবে। প্রথমত, স্বাভাবিক নিয়মে যেসব চার্জ রয়েছে তা বাংলাদেশ পাবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ আমদানি করে বেশি, রপ্তানি করে কম। তাই কিছু কন্টেইনার খালি ফেরত যায়। ভারত এই দুই বন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানিতে ওই খালি কন্টেইনার ব্যবহার করবে। এখান থেকেও বাংলাদেশ আয় করতে পারবে।

এ লাভের হিসাবে ব্যাপারে অবশ্য স্থানীয় কর্মকর্তাদের সংশয় রয়েছে। তাদের বক্তব্য হলো, ভারত বাংলাদেশের এই দুই সমুদ্রবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি দুইই করবে। কাজেই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ফেরত যাওয়া খালি কন্টেইনার ভারত আদৌ ব্যবহার করবে কীনা বা তাতে বাংলাদেশের কোনো লাভ সেভাবে হবে কিনা সংশয় রয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের কোনো কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ভারত যে কোনোভাবেই তার স্বার্থ আদায় করেই ছাড়বে। কিন্তু বিনিময়ে বাংলাদেশের ভাগ্যে মূলত কিছু আশ্বাসবাণী ও প্রতিশ্রুতি ছাড়া তেমন কিছু জুটছে না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে ২০১৫ সালের জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের সময়ই এ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল দুই দেশ। যদিও ওই সময় বাংলাদেশের নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল তিস্তা চুক্তির বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে কোনো বড় ইস্যুতে ছাড় না দেয়ার।

কিন্তু ওই সময়ও ভারতের চাপে বাংলাদেশ চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার সংক্রান্ত সমঝোতায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছিল। বিনিময়ে তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে বরাবরের মতোই প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে ভারতের পক্ষ থেকে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই সূত্র আরো জানায়, সেই সমঝোতা স্মারকেই স্পষ্টভাবে বলা আছে, ভারত এই দুই সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে পণ্য আমদানি-রপ্তানি দুইই করবে। ভারত এই দুই বন্দর ব্যবহার করে পণ্য আমদানি রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সড়ক, রেল ও জল-তিন পথই ব্যবহার করতে পারবে।

এদিকে, বুধবার সচিবালয়ে শুরু হওয়া দুই দেশের নৌসচিবদের বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন দুই দেশের সচিব। তবে, বৈঠক শেষে তারা কেউ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হননি।

বাংলাদেশের নৌসচিব অশোক মাধব সাংবাদিকদের জানান, এই বৈঠকে পায়রা বন্দরে একটি টার্মিনাল নির্মাণসহ মোট চারটি চুক্তির বিষয়ে তারা আলোচনা করবেন। ‘মঙ্গলবার দুদেশের নৌ প্রটোকল রুটের কমিটি মিটিং করেছে, বুধবার সচিব পর্যায়ের সভা। এখানে আমরা চারটি বিষয়ে আলোচনা করব।’

তিনি বলেন, বৈঠকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার, পায়রা বন্দরে মাল্টিপারপাস (কন্টেইনার) টার্মিনাল নির্মাণ, লাইটহাউজ ও লাইটশিপ ব্যবহার, কোস্টাল ও প্রটোকল রুটে যাত্রী ও ক্রুজ সার্ভিস নিয়ে এই চার চুক্তি হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, ‘তারা কীভাবে বন্দর ইউজ করবে এটা নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করে একটি এগ্রিমেন্ট চূড়ান্ত করব। যেটার ড্রাফট আগেই করা হয়েছে, দুই দেশ এটা নিয়ে মতবিনিময়ও করেছি। আজ আনুষ্ঠানিকভাবে মতবিনিময়ে করে এটা চূড়ান্ত করব।’

বন্দর ব্যবহারের ফি নির্ধারণের বিষয়ে জানতে চাইলে অশোক মাধব বলেন, এ ধরনের চুক্তির তিনটি পর্যায় থাকে। প্রথমে হয় সমঝোতা স্মারক, এরপর এগ্রিমেন্ট, তারপর এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর)। স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওরে ফি নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে জানিয়ে সচিব বলেন, ‘আজ আমরা শুধু এগ্রিমেন্ট করব।’

তিনি জানান, দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি কমিটি করার কথা থাকবে চুক্তির একটি ধারায়। সেই কমিটিই পরে এসওপি তৈরি করবে।

এ চুক্তি অনুযায়ী ভারতকে দু’টি বন্দর ব্যবহারে কি কি সুবিধা দেয়া হবে – এমন প্রশ্নের জবাবে নৌপরিবহণ সচিব বলেন, ‘সাধারণভাবে বা বিশেষভাবে ভারতকে কোনো সুবিধা দেয়া হবে না। শুধু আমাদের রুটটা ব্যবহার করার জন্য চুক্তিটা করব। আন্তর্জাতিক অন্যান্য বন্দর ব্যবহার করলে যেভাবে বন্দর লেভি পায় সবকিছু প্রযোজ্য থাকবে। কাস্টম, বন্দরের যেসব চার্জ সবই তারা (ভারত) দেবে।’

পায়রা বন্দরের কাজকে নয় ভাগে ভাগ করা হয়েছে জানিয়ে অশোক মাধব বলেন, ‘একটি কম্পোনেন্টে ভারত সহায়তা করতে সম্মত হয়েছে। এ বিষয়ে আজ আমরা আলোচনা করে একটি এগ্রিমেন্টে পৌঁছাব।’
পায়রা বন্দরের টার্মিনাল নির্মাণের কাজ ভারতকে দেয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নৌসচিব আরো বলেন, ‘ভারত পিপিপি (সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব) বা সরাসরি বিনিয়োগের যে কোনো একটি পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করে টার্মিনাল নির্মাণ করবে। এটা পরে আলোচনা করে ঠিক করা হবে। প্রাথমিকভাবে ঠিক হয়েছে, ভারতের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করবে।’

পায়রা বন্দরের জন্য এখনো কারো কাছ থেকে অর্থায়ন চাওয়া হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা ইআরডিতে (অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ) একটি পিডিপিপি (প্রাইমারি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোফর্মা) পাঠয়েছি। ১২৫টি দেশ বিভিন্ন কম্পনেন্টে তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভারতের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।’

বাংলাদেশের নৌসচিব বলেন, সমুদ্র ও নৌপথে চলাচলে নির্দেশনামূলক বয়া, বাতিগুলো দু’দেশ কীভাবে একসঙ্গে পরিচালনা করব এবং বয়া, বাতিসহ এগুলো যারা পরিচালনা করবে, তাদের প্রশিক্ষণ কীভাবে হবে- সেসব বিষয়ে আলোচনা করে একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করা হবে।

সচিব আরো বলেন,‘আমরা প্যাসেঞ্জার ক্রুজ সার্ভিস চালু করব। টুরিস্টরা ভারত থেকে বাংলাদেশে এসে যে কোনো জায়গা দেখতে পারবেন। একটা রুট করে দেয়া হবে, সেই রুটে তারা পরিদর্শন করতে পারবেন। একইভাবে বাংলাদেশ থেকে যে কোনো জাহাজ টুরিস্ট নিয়ে ভারতে যেতে পারবে। ভারতের কোনো কোনো বন্দরে যেতে পারবে তা আমরা নির্ধারণ করব।’

তবে এ পর্যন্ত নেয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ক্রুজশিপের পর্যটকরা জাহাজ থেকে নামতে পারবেন না বলে অশোক মাধব জানান। জাহাজে থেকেই তারা দেখতে পারবেন। আগে তো জাহাজের ক্রুরাও নামতে পারতেন না। এবারের চুক্তিতে দুই দেশের ক্রুদের তিন দিনের অন অ্যারাইভালের ভিসা দেয়ার কথা থাকবে। প্যাসেঞ্জার নামার বিষয়টি হয়ত পরবর্তী সভায় আসতে পারে। আগে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হবে, পরে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

পায়রা বন্দরে টার্মিনাল নির্মাণে কোনো কোম্পানি আগ্রহ দেখিয়েছে জানতে চাইলে ভারতের নৌসচিব রাজীব কুমার জানান, ইন্ডিয়ান পোর্ট গ্লোবাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বেসরকারি কয়েকটি কোম্পানি পায়রা বন্দরে টার্মিনাল নির্মাণে আগ্রহী।

ভারত কবে থেকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করতে চায় – এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা যত দ্রুত সম্ভব সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তি ও এসওপির সম্পন্ন করার চেষ্টা করছি। আশা করছি, এ মাসের মধ্যেই এটা শেষ হবে।

আগামী ১৮ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন দিনের সফরে ভারত যাচ্ছেন। বৈঠকের আলোচনা প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত কিনা এ বিষয়ে নৌসচিব বলেন, ‘এটা এ মুহূর্তে বলতে পারব না। সচিব পর্যায়ের, জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটির সভা তিন মাস পর পর হয়।

এখানে যে চুক্তিগুলো আমরা চূড়ান্ত করব সেগুলো ওখানে (প্রধানমন্ত্রীর সফরে) চূড়ান্ত হবে কী-না তা আমাদের পর্যায়ে বলতে পারব না। সেটা ইআরডি ও ফরেন মিনিস্ট্রি বসে ঠিক করবে ওখানে কোন কোনগুলো স্বাক্ষরিত হবে।’
সুত্র:South asian monitor

এআই