১৫ জুলাইয়ে তুরস্কের ইতিহাসের ভয়াবহ সেনা ক্যু ব্যর্থ হবার প্রেক্ষিতে প্রায় একই সূরে কথা বলে দেশের সবকটি রাজনৈতিক দল। ব্যর্থ ক্যু পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর ক্ষেত্রে সরকারকে সব ধরণের সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলো। তারা প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে ও সংসদে বক্তব্যের মাধ্যমে এই সমর্থনের কথা জানান।
বুধবার (২০ জুলাই) দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রায় ৫ ঘন্টাব্যাপী দীর্ঘ এক বৈঠকে এই জরুরী অবস্থা জারী করার বিষয়টি চুড়ান্ত করা হলে রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান প্রেসকনফারেন্সের মাধ্যমে বিষয়টি জাতিকে অবহিত করেন।
বৃহস্পতিবার (২১ জুলাই)সংসদ অধিবেশনে ভোটাভোটির মাধ্যমে অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব আকারে পেশ করা হলে অধিকাংশের ভোটের ভিত্তিতে প্রস্তাবটি পাশ হয়ে যায়।
বিরোধীদলের বিরোধীতা
ক্যু পরবর্তীতে সরকারকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিলেও জরুরী পরিস্থিতির পক্ষে ভোট দেয়নি দেশটির বিরোধী দল সিএইচপি । বুধবারই তারা ভোট দেবেনা বলে মিডিয়াকে জানিয়েছিল।
সিএইচপির সভাপতি কিলিচ দারউলো বলেন, “জরুরী অবস্থার পক্ষে আমাদের সদস্যরা ভোট দেবেনা। কারণ আমাদের অবস্থান সর্বদা গণতন্ত্রের পক্ষে।”
উল্লেখ্য, গত বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে শতকরা ২৪ ভাগের একটু বেশী ভোট পেয়েছিল আতাতুর্ক প্রতিষ্ঠিত ও কট্টর ধর্মনিরপেক্ষ এ দলটি।
সমর্থন জানায়নি এইচডিপি
কুর্দীদের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল এইচডিপিও জরুরী অবস্থার বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। উল্লেখ্য, গেল নির্বাচনে শতকরা দশভাগ ভোট নিয়ে শর্ত পুরণ করে প্রথমবারের মত সংসদে প্রতিনিধত্ব করছে দলটি। দলটির বিরুদ্ধে দেশের সরকারের সাথে যুদ্ধরত কুর্দী সন্ত্রাসীগোষ্ঠী পিকেকে’র মদদ দাতা হিসেবে অভিযোগ রয়েছে বহুদিন থেকেই।
সমর্থন দিয়েছে এমএইচপি
তুরস্কের সংসদের তৃতীয় বৃহত্তম দল এমএইচপি জরুরী অবস্থার পক্ষে ভোট দিয়েছে। দলটির সভাপতি দেওলেত বাহচেলি এর আগে সরকারকে বিদ্রোহ দমন ও পরবর্তীতে গৃহীত সব পদক্ষেপে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আজও ভোট দিয়ে তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন।
উল্লেখ্য, তুরস্কের সংসদে সরকারী দল একে পার্টি’র একক সংখ্যাগরিষ্টতা থাকায় এ ধরনের যে কোন প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সরকারী দল একাই যথেষ্ট।
বিরোধী দল কি সুর পাল্টাচ্ছে?
জরুরী অবস্থার পক্ষে ভোট না দেয়ায় দেশের বিরোধী দল ও আতাতুর্কের আদর্শে বিশ্বাসী সিএইচপি’র কঠোর সমালোচনা করে টুইটারে মন্তব্য করছেন সরকারী দলের কোন কোন মন্ত্রী ও এমপি।
তাদের ভাষায়, বিরোধ দল তাদের আসল চেহারা প্রকাশ করেছে। কেউ কেউ এমন মন্তব্যও করছেন, সেনা ক্যু সফল হলে তারা সেনাবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতো। কারণ অতীতের সেনা ক্যু গুলো থেকে দলটির উপকৃত হবার নজির রয়েছে তুরস্কের ইতিহাসে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল্লাহ গুলের তৎপরতা
তুরস্কের ১১তম রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. আবদুল্লাহ গুল সেনা ক্যু’র রাত থেকেই সক্রিয়ভাবেই সহযোগিতা করে যাচ্ছেন সরকারকে। বিদ্রোহের সময় মিডিয়াতে স্কাইপে দেয়া তার কঠিন ও গোছালো বক্তব্য বিদ্রোহ দমনে জনতাকে রাজপথে নামতে যথেষ্ট সহায়কের ভুমিকা রেখেছিল।
বৃহস্পতিবার আবদুল্লাহ গুল সংসদ অধিবেশনের আগে প্রধানমন্ত্রী ও স্পীকারের সাথে সাক্ষাত করেন। তাছাড়া রাতের মধ্যেই সেনাপ্রধান ও সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির সাথেও সাক্ষাত করবেন বলে জানা যায়।
সাথে আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীও
দেশটির সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য আহমত দাভোতউলোও যথাসাধ্য সহযোগিতা করে যাচ্ছেন সরকারকে। বুধবারও এক বক্তব্যে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির সময়োচিত সঠিক ও সাহসী পদক্ষেপেই রক্ষা পেয়েছে তুরস্কের গণতন্ত্র।
অনেকের মতে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সবাইকে নিয়ে এক সাথে ভয়াবহ এই পরিস্থিতি মোকাবেলার ইচ্ছা করলেও এবং ক্যু ব্যর্থতার পরবর্তী কয়েক দিন তার প্রমাণ পাওয়া গেলেও, জরুরী অবস্থা জারি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে যে ফাটল দেখা দিয়েছে তা এরদোয়ানের জন্য কিছুটা অশনি সংকেতই বটে।
একই সাথে সামনের দিন গুলোতে ক্যু’র সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বিরোধীদলকে কতটুকু সাথে পাবেন এরদোয়ান, তা কেবল সন্দেহেরই সৃষ্টি করছে।
এদিকে, বিদ্রোহের সপ্তম দিনে এসে রাজনৈতকিদলগুলোর মাঝে যে অনৈক্যের রেখা প্রকাশিত হয়েছে, তা রাজপথের দাবীর আলোকে বিদ্রোহীদের পুরোপুরি দমনের জন্য মৃত্যুদন্ডের বিধান সংবিধানে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও বাধার সৃষ্টি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কেবি





