ইতিহাস কখনো গোপন বা ধামাচাপা থাকে না। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক অত্যাচারী শাসকের নাম শোনা যায়। নিজ শাসনামলে যারা একেকজন রীতিমতো দেবতার আসনে সমাসীন ছিলেন। কিন্তু ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করেনি। সেই ফেরাউন, নমরুদ, চেঙ্গিস খা, হালাকু খা, হিটলার, মুসোলিনী-এমন শত শত নাম পাওয়া যাবে যাদের সব কর্মকান্ডই ইতিহাসে যথাযথভাবে বিধৃত হয়েছে।
পৃথিবীবাসীকে সভ্যতার সবক দিয়ে বেড়ানো আমেরিকা আফগানিস্তান, ইরাকজুড়ে যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে মিডিয়ায় শত কৌশলী ইতিবাচক প্রচারনা সত্ত্বেও কি মার্কিনীরা তাদের সেই নিষ্ঠুরতাকে আড়াল করতে পেরেছে? উপমহাদেশে দু’শ বছরের শাসনামলে এদেশের মুসলমানদের ওপর যে অত্যাচার নির্যাতন ব্রিটিশ বেনিয়ারা চালিয়েছে তা কি কোনদিন ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে? আমাদেরই পূর্বপুরুষ সেই নীল চাষীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন, ইংরেজদের সাথে তালমিলিয়ে হিন্দু জমিদারা এদেশের খেটে খাওয়া মুসলমানদের ওপর যে পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছিল তা কি ভুলে যাবে এদেশের মানুষ? পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতাকে কি কোন কিছু দিয়ে পুষিয়ে দেয়া যাবে?
তবে, সকল অত্যাচার নির্যাতনের শত কালিমালিপ্ত ইতিহাসই যেন আজ ম্লান হয়ে গেছে ছোট্ট একটি ভূখন্ড ফিলিস্তিনের মুসলমানদের ওপর যায়নবাদী ইসরাইলী নিষ্ঠুরতার কাছে। বৃদ্ধ, নারী ও শিশু থেকে শুরু করে কেউই রক্ষা পাচ্ছে না ইসরাইলী নিষ্ঠুরতার হাত থেকে।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী গত মঙ্গলবার থেকে শনিবার (৮-১২জুলাই ২০১৪) পর্যন্ত ৫ দিনেই গাজায় দেড় শতাধিক প্রানহানী ঘটেছে। আহত হয়েছে হাজারের ওপর। শত শত বাড়িঘর হয়েছে বিধ্বস্ত। ছোট ছোট নিস্পাপ শিশুর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে ফিলিস্তিনের আকাশ-বাতাস। ফুটফুটে শিশুদের এমন আহাজারিতে হয়তোবা আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেপে উঠছে। কিন্তু ইসরাইলী নিষ্ঠুর হায়েনাদের অন্তরে এর কোন প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়নি।
গাজায় ইসরাইলি নির্মমতায় কেঁদে উঠেছে বিশ্ব বিবেক। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে হাজারো বিবেকবান মানুষ তাদের আকুতি জানিয়েছেন এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধে। আমেরিকার মদদপুষ্ঠ ইসরাইলের যদিও এতে কিছু যায় আসে না। বিবেকবান মানুষের এই আকুতিই এবার খানিকটা তুলে ধরা যাক। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এসব অভিব্যক্তি করেন ইসরাইলী নির্মমতায় হতবাক মানুষগুলো। নিচে এবার এমনই কিছু মন্তব্য তুলে ধরছি:
প্রভাষ আমীন: ইরাকহোক, সিরিয়া হোক, লিবিয়া হোক, অাফগানিস্তান হোক; কোথাও কিছু ঘটলেই আমেরিকা লাফ দিয়ে সেখানে চলে যায়। মানবাধিকার নিয়ে তাদের চিল্লাফাল্লার শেষ নেই। ফিলিস্তিন কি পৃথিবীর বাইরের দেশ? সেখানে যারা থাকে তারা কি মানুষ নয়, সেখানে কি মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে না?
শান্তিতে নোবেল জয়ী বারাক ওবামা সাদা বাড়িতে ঘুমান কিভাবে? আগাম পেয়ে যাওয়া নোবেল পদক জায়েজ করার জন্য হলেও তো ওবামার একটু নড়াচড়া করা দরকার।
জাতিসংঘের বিশাল শান্তিরক্ষী বাহিনী আছে। সেই বাহিনী এখন কোথায়? ফিলিস্তিনের মানুষের কী শান্তি লাগে না? ফিলিস্তিনি শিশুরা কি জন্মই নিয়েছে ইসরায়েলের টার্গেট প্র্যাকটিসের জন্য? ফিলিস্তিনে যা হচ্ছে, এই একবিংশ শতাব্দীতে নিজেদের মানুষ বলতে লজ্জা হয়।
নুরুন্নবী: গাজার মুসলিমদের এই দুর্দিনে সবচেয়ে বেশি সংহতি প্রকাশ করা উচিত বাংলাদেশীদের। কারণ গাজার সাথে বাংলাদেশের ভৌগলিক দিক থেকে অনেক মিল রয়েছে। গাজা তিনদিক থেকে শত্রু পরিবেষ্টিত একদিকে রয়েছে সমুদ্র আর সীমান্তের সামান্য একটি অংশ রাফা ক্রসিং মিশরের সাথে; একইভাবে বাংলাদেশও তিনদিক থেকে শত্রু পরিবেষ্টিত একদিকে সমুদ্র। আর সীমান্তের সামান্য একটি অংশ মিয়ানমারের সাথে।
অর্থ, বুদ্ধি, মিডিয়া, বিশ্ব নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা সব দিক থেকে ইন্ডিয়া যদি ইসরাইলের সমান হতো তাহলে বাংলাদেশের মুসলিমদের উপরও এরকম দুর্দিনআসার সম্ভাবনা ছিল। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আমরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল শত্রু দ্বারা পরিবেষ্টিত। তারপরও ইন্ডিয়া প্রতিনিয়ত সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশীদের হত্যা করতেছে যেটা গাজা-ইসরাইল সীমান্ত হত্যার তুলনায় বেশি।
যাইহোক আমরা যদি এখন গাজার ভাইদের দুর্দিনে সোচ্চার হই তাহলে আমাদের দুর্দিনেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলিমরা আমাদের জন্য সোচ্চার হবে। আর মুসলিমদের সবচেয়ে বড় পরিচয় তারা মুসলিম; আমাদের মাতৃভাষা যাই হউক না কেন, আমরা গাজার মুসলিম, রোহিঙ্গা মুসলিম, আসামের মুসলিম, বাঙালি মুসলিম যাই হই না কেন বিশ্বাসের দিক থেকে আমরা সবাই একই. সবাই সবার দুর্দিনে কথা বলা উচিত, প্রতিবাদ করা উচিত, এগিয়ে আসা উচিত।
রাসুল (সা:) বলেছেন "ঈমানদারগণ তাদের পারস্পরিক মায়া-মমতা ও সহানুভূতি হিসেবে এক শরীরের ন্যায়। যখন কোনো অঙ্গ অসুস্থ হয় তখন বাকি শরীর অনিদ্রা ও জ্বরে ভোগে" (বুখারী, মুসলিম)
জহির উদ্দিন রাসেল: হে আল্লাহ ! এই পবিত্র রমাযান মাসের উসিলায় আপনি ফিলিস্তীনের মুসলামানদের অভিশপ্ত ইহুদিদের হাত থেকে হেফাজত করুন । হে আল্লাহ ! অভিশপ্ত ইহুদিদের ধ্বংস করুন। (হিটলার বলেছিল... আমি চাইলে সব ইহুদীদের হত্যা করতে পারতাম, কিন্তু কিছু ইহুদী বাচিয়ে রাখেছি। যাতে পৃথিবীর মানুষ বুঝতে পারে, আমি কেন ইহুদী হত্যায় মেতেছিলাম" হিটলারের সেই উক্তির মর্মার্থ আমরা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
মোকাররম হোসাইন: গত কয়েকদিন থেকে ফিলিস্থিনে ইসরাইলের বর্বরতা নিয়ে নেট জগতে যে জিনিসটার জন্য ইসলামিষ্ট্ররা "মাতম" করতাছে সেটা হল "মিডিয়া" । বলা হচ্ছে, মিডিয়া ইসরাইল ফ্রেন্ডলী আর মুসলিম বিরোধী । আলবত খাটি কথা। তয় ভাইয়ারা ঐ মিডিয়া গুলো ইয়াহুদীরা তৈরী করেছে।
"গড" আকাশ থেকে পাঠিয়ে দেয় নাই। ওর জন্য ওরা মেহনত দিছে, ত্যাগ স্বীকার করেছে, বউ বাচ্চা চুলায় দিছে। সো ওগুলো তো ওদের সার্ভিস দিবে, নাকি আপনাকে দিবে? আপনাদের মিডিয়া নাই, করতে পারেন নাই, করতে পারেন না। এটা আপনার ব্যর্থতা। এর জন্য ওদের মিডিয়াগুলোকেদায়ী না করে নিজে কিছু করে দেখান। না পারলে নিজের হাত নিজেই কামড়ান , চুল ছিড়েন, মাতম করেন।
ওরা মিডিয়া করেছে, সেগুলো দিয়ে আপনাকে মারবে, আপনি ঐ সময় ফতোয়া খুঁজেন, দানের টাকা কোথায় দিলে কত কোটি সওযাব । সেই হিসেরের টালি করতেই থাকেন।
ওরা মিডিয়া দিয়ে আপনার বাচ্চাদের ইয়াতিম বানায় আর আপনি আপনার টাকা দিয়ে ইয়াতিম পালেন। পার্থক্য এই তো? ভালো তো, ভালো না? কথায় আছে ভাইয়ের সাথে না পেরে ভাবির শাড়ি ধরে টানা টানি। সেটাই করতাছেন, করবেন।
সমস্যা হচ্ছে, এগুলো বলতে গেলে আপনি বদ। নামাজ ঠিক মত পড়েন কি না, ঈমান ঠিক আছে কি না, এয়ানত দেন কি না । ইত্ত্যেকার সব প্রশ্ন । আরে ভাই, যারা একটা ভালো মানের ওয়েবাসাইট চালাতে পারে না, তারা আস্ত একটা দেশ চালাবে কেমনে? আর জনগণ তাদের ভোটেই বা দিবে কেমনে?
মোস্তফা ইমরুল কায়েস: আতংকেউঠে কান্নায় ভাসি নিষ্পাপ শিশুর লাশ দেখে, মিষ্টি চেহারাখানা ক্ষত বিক্ষত রক্ত শুধু দিচ্ছে ধুয়ে। হানছে আঘাত ওই ইজরাইল, মারছে তারা মানুষ, তাদের কাছে ওরা কেবল হত্যাযজ্ঞ ফানুশ।
মাসুম মাহবুব: হামাসের ওপর হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল। শাহাদাত বরন করছে নিরিহ অনেক ফিলিস্তিনবাসী। ফাতাহ চুপ! হামাস ফাতাহ দুটো দলই হলো ফিলিস্তিনের। ফাতাহ কেনো চুপ ? পুরো বিশ্ব যখন ঘৃনা আর নিন্দা জানাচ্ছে ইসলাইলের এই হামলার, তখন বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলো ২৫০ প্রকার ইফতার নিয়ে ব্যস্ত।
সৌদিআরব শরীয়া আইনের দেশ হলেও মিশরে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের সরকার মুরসিকে সরিয়েছে স্যাকুলার সিসিকে দিয়ে। ইরান, লেবানন বা তুরস্ক যারা ইসরাইলের সমালোচনা করছে বা ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলছে তাদের কোনঠাসাকরতে আবার মুসলিম সরকার প্রধানরা ওবার সাথে মিলিত হচ্ছে। একসুরে ইসরাইলের পক্ষে কথা বলছে।
এখন বলুন ফিলিস্তিনের এই হত্যাযোগ্যের জন্য আসলে দায়ী কে ?
আল্লাহ বহুবার কোরআনে বলেছে, কেয়ামতের আগ পর্যন্ত মুসলমানদের চীরশত্রু হিসেবে থাকবে ইহুদীরা। তাহলে যারা তাদের সাথে আত্মীয়তা বা বন্ধুত্ব করছে তাদের বিচার কি হওয়া উচিত ? আমরা তথাকথিত মুসলিমরাই কি দায়ী নই ফিলিস্তিনের কান্নার জন্য ?
শংকর মৈত্র: গাজায় নিরীহ মানুষ হত্যার ঘটনায় শান্তিতে নোবেল জয়ী ড.ইউনূসের কোনো বক্তব্য চোখে পড়েনি। তিনি কি বিবৃতি দেননি না আমি অন্ধ হয়ে গেলাম?
আব্দুস সালাম: একমাত্র হিটলাই পৃথিবী থেকে ইহুদীদের শেষ করে দিতে চেয়েছিলো। কারণ সে বুজতে পেরেছিলো ইহুদীরা পৃথিবীর জন্য কতটা ভয়ঙ্কর
জাহাঙ্গীর কবির লিটন: ফিলিস্তিনে ইহুদীদের বর্বর হামলায় প্রতিটি বিবেকবান মানুষের হৃদয় রক্তাক্ত, ক্ষত-বিক্ষত। দেশে-বিদেশে বিক্ষোভে ফেটে পড়ছেন মুসলমানরা। কিছু দেশে বিবেকবান ইহুদীরাও বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন।
কিন্তু, বাংলাদেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি; একদল ব্যস্ত মসনদ ধরে রাখার কাজে, অন্যদল ব্যস্ত মসনদ দখলের ধান্দায়। ৯৫%মুসলমানের দেশে যাদেরকে নিয়ে তারা রাজনীতি করেন তারা সবাই আজ ফিলিস্তিনি ভাইদের নির্মম মৃত্যুতে শোকাহত এবং ইসরাইলের প্রতি ঘৃনায় ফেটে পড়ছে। একবারের জন্যও সংগঠন দুটিকে এমনকি তাদের কোন অংগ সংগঠনকে দেখলাম না মুসলমান ভাইদের পক্ষে রাস্তায় নামতে। ৯৫% মুসলমান আপনাদের এই নিরবতার অর্থ কি বুঝেনা? অবশ্যই বুঝে, সময়মত আপনারা টের পাবেন।
সালেহ বিপ্লব: এক একটা ছবি দেখছি, চোখের জলে একাকার আমার বিশ্ব! কতগুলো শিশুর মৃতদেহ, রক্তেভেজা নিথর শরীর। ক্ষতবিক্ষত কতগুলো কচিমুখ, ছোট্ট শরীর যন্ত্রনায় কাতরায় হাসপাতালের বেডে! এই পবিত্র রমজানের মাসেও ইহুদী নেতানিয়াহুর দাঁত-নখ থেকে রেহাই পাবে না ফিলিস্তিন?
ইবলিশের এক হাত ওবামার কাঁধে, আরেক হাত চেটে খায় বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু! রক্ষা কর, আল্লাহ। প্রার্থনা করি, বেজন্মা কোন ইহুদীকেও যেন সন্তানের এই অবস্থা দেখতে না হয়।
বিবেকমান মানুষের এসব আহবান হয়তো কোনদিনই বর্বর ইসরাইলীদের কানে যাবে না। সমাজকল্যাণের সেই সূত্র ধরেই হয়তো আগাতে হবে। সূত্র অনুযায়ী, কিছু লোক উপদেশে শোধরায়, কেউ ধমকে, কেউ আঘাতে। সম্ভবত ইসরাইলকে দমাতে সমাজকল্যাণের শেষোক্ত সূত্রই ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু কে করবে এই সূত্রের ব্যবহার? জাতিসংঘ, আমেরিকা নাকি মুসলিম জনগোষ্ঠী? ভবিষ্যতই বলে দেবে।

ঢাকা, ১৩ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম)





