নিউজিল্যান্ড ওশেনিয়ার একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। এর রাজধানীর নাম ওয়েলিংটন। দেশটি অসংখ্য ক্ষুদ্র দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। আদিম অধিবাসীদের ভাষা হল মাওরি। নিউজিল্যান্ড ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন একটি দেশ।
এটি অস্ট্রেলিয়ার প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে তাসমান সাগরে অবস্থিত; ফিজি, টোঙ্গা এবং নুভেল কালেদোনি হলো নিউজিল্যান্ডের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। এদেশের পরিবেশ এবং প্রাণীকুল বৈচিত্র্যময়। এখানকার অধিকাংশ মানুষ ইউরোপীয় বংশদ্ভূত এবং স্থানীয় মাওরি হল সর্বাধিক সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠী।
এছাড়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এশীয় বংশদ্ভূত মানুষও এখানে বসবাস করে। ইংরেজি নিউজিল্যান্ডের সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা। দেশটির জীবন-যাত্রার মান, প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল, শিক্ষার হার, শান্তি ও অগ্রগতি, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে শীর্ষ স্থানীয় একটি দেশ।
পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় জীবনমানের কারণে অনেকেরই বিশেষ আগ্রহ দেখা যায় দেশটির প্রতি। দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান হল ইংল্যান্ডের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ।
নিউজিল্যান্ডের ইতিহাস
প্রায় ৭০০ বছর আগে পলিনেশীয় বিভিন্ন জাতি নিউজিল্যান্ড আবিষ্কার করে ও এখানে বসতি স্থাপন করে। এরা ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র মাওরি সংস্কৃতি গড়ে তোলে। ১৬৪২ সালে প্রথম ইউরোপীয় অভিযাত্রী, ওলন্দাজ আবেল তাসমান, নিউজিল্যান্ডে নোঙর ফেলেন।
১৮শ শতকের শেষ দিক থেকে অভিযাত্রী, নাবিক, মিশনারি, ও বণিকেরা নিয়মিত এখানে আসতে থাকে। ১৮৪০ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও নিউজিল্যান্ডের মাওরি গোত্রগুলি চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং এর ফলে নিউজিল্যান্ড ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে আসে।
মাওরিদেরকে ব্রিটিশ নাগরিকদের সমান মর্যাদা দেওয়া হয়। এসময় নিউজিল্যান্ডে ব্যাপকভাবে ইউরোপীয় বসতি স্থাপন শুরু হয়। ইউরোপীয় অর্থনৈতিক ও বিচার ব্যবস্থা আরোপের ফলে মাওরিরা তাদের বেশিরভাগ জমিজমা ইউরোপীয়দের কাছে হারিয়ে দরিদ্র হয়ে পড়ে।
১৯৩০-এর দশকে নিউজিল্যান্ডকে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা হতে থাকে। অর্থনীতিতে সরকারের হস্তক্ষেপ বাড়ানো হয়। একই সময়ে মাওরিদের মধ্যে এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব বা রেনেসাঁস ঘটে। মাওরিরা বিরাট সংখ্যায় শহরে বসতি স্থাপন করা শুরু করে এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করে।
১৯৮০-এর দশকে অর্থনীতিতে সরকারি হস্তক্ষেপ হ্রাস করা হয় এবং অনেক উদারপন্থী নীতি বাস্তবায়ন করা হয়। বৈদেশিক সম্পর্কের ব্যাপারে অতীতে নিউজিল্যান্ড যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের অনুসারী ছিল, তবে বর্তমানে এ ব্যাপারে দেশটি অনেক স্বাধীন।
নিউজিল্যান্ডে উচ্চ শিক্ষা:
উচ্চ শিক্ষায় বিশ্বের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম নিউজিল্যান্ড। বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী পাড়ি জমায় এই দ্বীপ দেশে। দেশটির আটটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলোই শিক্ষার মানগত দিক বিবেচনায় বরাবরই বিশ্বসেরাদের তালিকায় থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে ডিপ্লোমা থেকে পিএইচডি পর্যন্ত কোর্সের ব্যবস্থা রয়েছে। এর বাইরে বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি টার্সিয়ারি প্রতিষ্ঠানে ডিপ্লোমা থেকে এমবিএ কোর্সের ব্যবস্থা রয়েছে। দেশটির যেকোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য একাডেমিক ভাল ফলাফল ও ইংরেজিতে দক্ষ হতে হয়। দক্ষতা প্রমাণের জন্য আইইএলটিএস পরীক্ষায় ন্যুনতম ৫.৫ থেকে ৬.৫ স্কোর করতে হয়।
এখানে বছরে টিউশন ফি আট লাখ থেকে আঠারো লাখ টাকা। থাকা-খাওয়া বাবদ বছরে খরচ হয় ছয় থেকে বারো লাখ টাকা। এখানে পড়াশুনার সময় সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা খণ্ডকালীন কাজের অনুমতি রয়েছে। এর বাইরে ছুটির সময় ফুলটাইম কাজ করা যায় ।
দুই বছর ডিপ্লোমা কোর্স অথবা পোস্ট গ্রাজুয়েট লেভেলের এক বছরের কোর্স শেষ করার পর ওয়ার্ক পারমিট ভিসার সুযোগ রয়েছে। রয়েছে ভাল ফলাফলের জন্য বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা। এরপর পর্যায়ক্রমে শিক্ষার্থীরা স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেয়ে থাকে। যে সুযোগ উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই নেই।
আর যেখানে আছে সেখানকার প্রক্রিয়া খুবই জটিল। তাই নিউজিল্যান্ডের এই সুযোগ গ্রহনে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
নিউজিল্যান্ড এ ভিসা প্রসেসিং সিস্টেম- অফার লেটার পাওয়ার পর ছাত্রছাত্রিদের সকল ফিনান্সিয়াল কাগজপত্রসহ নিউজিল্যান্ড হাইকমিশন এর অথরাইজড ভেরিফিকেশন অফিস বিএনজেডইফ নামক একটি প্রতিষ্টান এ তাদের ফি সহ জমা দিতে হবে ।
তারা কাগজগুলো সরাসরি গিয়ে যাচাই করবে এবং নিরধারিত এক মাস পনের দিন পর ফলাফল দিয়ে থাকে, যদি ফলাফল পজিটিভ হয় তাহলে ভিসা আবেদনপত্র নির্ধারিত ফি সহ সকল কাগজ পত্র নিউজিল্যান্ড হাইকমিশন (দিল্লি) এ পাঠাতে হবে; হাইকমিশন কাগজপত্র রিসিভ করার পর একজন সিনিয়র আফিসার ফাইল বন্টন করে ভিসা আফিসার দের কাছে এবং এজেন্ট অথবা ছাত্রছাত্রিদের ভিসা অফিসার এর নাম সহ ইমেইলে ইনফরমেশন দিয়ে থাকে।
যদি ছাত্র/ছাত্রির প্রোফাইল পজিটিভ হয় তাহলে নূন্যতম ১৫ দিন পর ভিসা কনফারমেশন ইমেইল এ জানিয়ে দেয় আর যদি প্রোফাইল পজিটিভ না হয় তাহলে একটি টেলিফোন ইন্টারভীউ হয় (৩০-৬০ মিনিট) আর এ ধরনের কেস এ ভিসা ডিসিশন পাওয়ার জন্য মিনিমাম ১.৫-৩ মাস সময় লাগতে পারে ।
ভিসা ডিসিশন যদি পজিটিভ হয় তাহলে এক বছরের টিউশন ফি ব্যাংকের মাধ্যমে এডুকেশন প্রোভাইডার কে পাঠিয়ে দিতে হবে আর আসল পাসপোট সহকারে মানি রিসিপ্ট পাঠাতে হবে হাইকমিশন এ এবং খুব তারাতারি হাইকমিশন ভিসা ষ্টাম্পিং করে ডাকযোগে নিরধারিত ঠিকানায় পাসপোট পাঠিয়ে দিয়ে থাকে।
নিউজিল্যান্ডে বিদেশি শিক্ষার্থী অধিক রিক্রুট করার পরিকল্পনা
নিউজিল্যান্ড গত বৃহস্পতিবার তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরও বিদেশি শিক্ষার্থীদের (বিশেষ করে এশিয়ানদের) আকৃষ্ট করতে মাল্টিমিলিয়ন ডলার বিপণন ড্রাইভ ঘোষণা করেছে । শিক্ষা মন্ত্রী স্টিভেন জয়েস বলেন, সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল নতুন বাজেটে নিউজিল্যান্ডের $৪০মিলিয়ন (মার্কিন $ ৩৩ মিলিয়ন) বিনিয়োগ করে নিউজিল্যান্ডকে চীন, ভারত, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার বাজারে প্রমশোনের আরো উন্নতি করা।
জয়েস বলেন, নিউজিল্যান্ড এ আটটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে এবং গতবছর প্রায় এক লাখ বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতে এসেছে নিউজিল্যান্ডে ।
জয়েস এর একজন মুখপাত্র বলেন, শিক্ষাগন্তব্য হিসেবে নিউজিল্যান্ড বিষয়ে এশিয়ানদের জানা-শোনা কম, তাই নিউজিল্যান্ডে উচ্চশিক্ষাকে এশিয়া অঞ্চলে প্রোমট করার জন্য ব্যাপক মার্কেটিং ড্রাইভ দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর অংশ হিসেবে এশিয়ান শিক্ষার্থীদেরকে প্রচুর বৃত্তি দেওয়া হবে এবং স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর সাথে নিউজিল্যান্ড এর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর লিয়াজো করা হবে । সাবেক নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট অধিনায়ক স্টিফেন ফ্লেমিং এই প্রচারনার নেতৃত্বে থাকবেন ।
জয়েস মনে করেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা নিউজিল্যান্ডের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ঢাকা, ৫ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএইচ





