মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ভারতীয় প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশেষ বাণিজ্য ব্যবস্থার ফলে ভারতের তুলা ও পোশাক শিল্পে তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
চুক্তির মূল শর্ত কী?
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে একটি নতুন বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর অধীনে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো নির্দিষ্ট কিছু তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে কোনো আমদানি শুল্ক ছাড়াই প্রবেশ করতে পারবে। তবে এই সুবিধা নির্ভর করবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তের ওপর— বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকেই তুলা, কৃত্রিম সুতা বা অন্যান্য টেক্সটাইল কাঁচামাল আমদানি করতে হবে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশ যত বেশি পরিমাণ মার্কিন তুলা বা টেক্সটাইল কাঁচামাল আমদানি করবে, তার আনুপাতিক হারে নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক শুল্কমুক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানির সুযোগ পাবে। এই ব্যবস্থাকে অনেক বিশ্লেষক ‘কাঁচামাল-নির্ভর শুল্ক ছাড়’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
ভারতের প্রত্যাশা ও হতাশা
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করলে ভারতীয় রফতানিকারকরা আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। কারণ একই সময়ে ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। মাত্র ১ শতাংশ পার্থক্য থাকলেও, অনেক ভারতীয় ব্যবসায়ী মনে করেছিলেন এতে তারা বাংলাদেশকে টপকে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাবেন।
কিন্তু নতুন চুক্তির ফলে সেই প্রত্যাশা অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেলে বাংলাদেশি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরও সস্তা ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে— যা ভারতের জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ।
ভারতের তুলা শিল্পে বড়ো ধাক্কার আশঙ্কা।
দ্য হিন্দুর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে প্রায় ১৪৭ কোটি ডলারের তুলার সুতা রফতানি করেছে, যা ভারতের মোট সুতা রফতানির একটি বড়ো অংশ। শুধু গত বছরেই ভারত বাংলাদেশে ১২ থেকে ১৪ লাখ বেল তুলা রফতানি করেছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ এবং দেশটির মোট পোশাক রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। অন্যদিকে, ভারতীয় তুলা ব্যবহার করে তৈরি প্রায় ২৬ শতাংশ পোশাক পণ্য বর্তমানে মার্কিন বাজারে প্রবেশ করে। নতুন চুক্তির ফলে বাংলাদেশ যদি মার্কিন তুলার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে ভারতের তুলা ও সুতা শিল্প সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিল্প নেতাদের উদ্বেগ
কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির (CITI) সেক্রেটারি জেনারেল চন্দ্রিমা চ্যাটার্জি বলেন, “আমার সবচেয়ে বড়ো ভয় হচ্ছে ভারতের তুলার সুতার ওপর তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা কিনে সেটি তাদের টেক্সটাইল মিলে ব্যবহার করতে পারবে, ফলে ভারতের ওপর নির্ভরতা কমে যাবে।”
তিনি আরও বলেন, `বাংলাদেশি রফতানিকারকরা চাইলে সুতা তৈরিতে মাত্র ১০ শতাংশ মার্কিন তুলা ব্যবহার করেও দাবি করতে পারেন যে, পুরো পণ্যই যুক্তরাষ্ট্রের তুলা দিয়ে তৈরি। যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এই বিষয়টি যাচাই করবে, সেটি স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশ যেহেতু তৈরি পোশাকে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, এতে আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারি।'
ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের ন্যাশনাল কমিটি অন টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান সঞ্জয় কে জৈন বলেন, “এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি নিট ও ওভেন পোশাক আমদানি করবে। এতে ১০০ শতাংশ সুতির পণ্য— যেমন : টি-শার্ট ও নারীদের টপস রফতানিতে ভারত তার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাতে পারে।”
আশার কথাও বলছেন কেউ কেউ।
তবে সব ভারতীয় ব্যবসায়ীই যে পুরোপুরি হতাশ, তা নয়। কেউ কেউ মনে করছেন, বাস্তবতার নিরিখে এই পরিবর্তন রাতারাতি ঘটবে না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করে সেখান থেকে সুতা তৈরি, তারপর পোশাক উৎপাদন— এই পুরো প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে বড়ো ধরনের লজিস্টিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
ভারতের কটন টেক্সটাইল এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক সিদ্ধার্থ রাজগোপাল বলেন, `বাংলাদেশ নিজে তুলা চাষ করে না, এমনকি কৃত্রিম তন্তুও উৎপাদন করে না। ১৯ শতাংশ শুল্ক মওকুফ পেতে হলে তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা বা এমএমএফ (ম্যান-মেড ফাইবার) সুতা আমদানি করতে হবে। তবে এমএফএন হার বহাল থাকবে।'
তিনি আরও বলেন, `মার্কিন তেল পেতে সময় লাগবে এবং পরিবহন ও সংরক্ষণের খরচও কম নয়। সব ধরনের পোশাক মার্কিন তুলা দিয়ে তৈরি করাও সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশকে পণ্যের মিশ্রণ পরিবর্তন করতে হবে এবং পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্বিন্যাস করতে হবে। এটি রাতারাতি হবে না।'
পুরোনো কোটা ব্যবস্থার ইঙ্গিত?
সিদ্ধার্থ রাজগোপাল মন্তব্য করেন, এই ব্যবস্থা অনেকটা ২০০০ সালের আগের কোটা ব্যবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যেখানে নির্দিষ্ট শর্ত ও সীমার মধ্যে বাণিজ্য পরিচালিত হতো। তাঁর মতে, এখন দেখার বিষয়— এই চুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং কত দ্রুত বাংলাদেশ এটি কাজে লাগাতে পারে।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন বাণিজ্য চুক্তি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বড়ো সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি ভারতের তুলা ও পোশাক রফতানিকারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে টেক্সটাইল ও পোশাক খাতে প্রতিযোগিতা এখন আরও তীব্র হতে চলেছে। এই চুক্তির বাস্তব প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা নির্ভর করবে সরবরাহ শৃঙ্খল, কাঁচামাল আমদানি ও বৈশ্বিক বাজারের গতিপ্রকৃতির ওপর— যার ফলাফল স্পষ্ট হতে সময় লাগবে।
এমএম