কাশ্মীরের পুলওয়ায় গত ১৪ ফেব্রুয়ারি এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় ভারতীয় একটি আধা সামরিক বাহিনীর ৪৪ জওয়ান নিহত হয়েছিলেন। এর পরেই পাল্টা হামলার হুমকি দিয়ে আসছিল নয়াদিল্লি।

মঙ্গলবার কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত অংশে সন্দেহভাজন বিদ্রোহীদের ঘাঁটি লক্ষ্য করে বোমাবর্ষণ করে ভারতীয় বিমান বাহিনী। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ হামলা বড় ধরনের সংঘাতে রুপ নিতে পারে।

ভারত সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, কাশ্মীর সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ রেখা লঙ্ঘন করে এই হামলায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতের দৃঢ় সংকল্পেরই প্রকাশ পেয়েছে।

নয়াদিল্লির অভিযোগ, ভারতের বিরুদ্ধে ছায়া যুদ্ধে বিদ্রোহীদের ব্যবহার করছে পাকিস্তান।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান বিজয় কুমার সিং বলেন, তারা (পাকিস্তান) বলছে- হাজারটা সমস্যা দিয়ে তারা ভারতকে ভোগাবে। কিন্তু আমরা বলছি, প্রতিটা সময় যখন আমাদের ওপর আপনারা হামলা চালাবেন, তখন নিশ্চিত থাকবেন যে কঠোর থেকে কঠোরতরভাবে পাল্টা আঘাত দেয়া হবে।

দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী প্রকাশ জাবেদখর সাংবাদিকদের বলেন, এটা অবিশ্বাস্য। একটি দেশের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

পাকিস্তান আগেই হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিল, ভারত হামলা চালালে তারা পাল্টা প্রতিশোধ নেবে। দেশটির সামরিক বিশ্লেষক হাসান আশকারি বলেন, ভারতের এই আক্রমণ একটি ভয়ঙ্কর পদক্ষেপ।

তিনি বলেন, যদি এমন অভিযান অব্যাহত থাকে, তবে বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এতে কারও কোনো লক্ষ্যই হাসিল হবে না-এ অঞ্চলটি কেবল মারাত্মক সংকটে পড়ে হাবুডুবু খাবে।

২০১৬ সাল থেকেই দুই দেশের মধ্যেই সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে। তখন কাশ্মীরে ভারতীয় সেনা ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে ১৯ জওয়ানকে হত্যা করেন বিচ্ছিন্নতাবাদীরা।

তখন নিয়ন্ত্রণরেখার অপর পাশে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাতটি শিবিরে সার্জিক্যাল হামলা চালানোর দাবি করেছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী। তবে পাকিস্তান বলছে, এমন কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি।

কাশ্মীরকে নিজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ভারত জোরালো দাবি করে আসলেও উপত্যকাটি আসলে একটি অধিকৃত অঞ্চল। ১৯৪৭ সাল থেকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এ নিয়ে দ্বন্দ্ব লেগে আছে।

হাতে গোনা কয়েকশ বিদ্রোহীর হাত থেকে রেহাই পেতে কাশ্মীরে সাত লাখের বেশি ভারতীয় সেনা মোতায়েন করা আছে। প্রতিবেশী পাকিস্তান বিদ্রোহীদের ঠাঁই দিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ ভারতের।

এই বিশাল সংখ্যক সেনাবাহিনী দিয়ে ভূস্বর্গের লোকজনকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। যদিও ভারত এমন দাবি অস্বীকার করছে।

কাশ্মীরিরা স্বাধীনভাবেই থাকতে পছন্দ করেন। তবে তাদের কেউ কেউ পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হয়ে যাওয়ার কথাও বলছেন।

ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৪৭ সাল থেকে অহিংস আন্দোলন করে আসছে কাশ্মীরবাসী। কিন্তু ১৯৮৮ সাল থেকে সেখানে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দাবিতে সশস্ত্র বিদ্রোহী শুরু হয়।

এখন পর্যন্ত ৮০ হাজার কাশ্মীরি হত্যার শিকার হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন আরও আট হাজার। গ্রেফতার, নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বেশুমার।

যদি উপত্যকাটির লোকজনকে কেউ জিজ্ঞেস করেন, তারা বলবে, কাশ্মীরের বেসামরিক লোকজনের সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনী যুদ্ধ করছে।

২০০৮ সাল থেকে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিয়মিতভাবে তাজা ও ছররা গুলি ছুড়ে আসছে সেনারা। এভাবে কাশ্মীরিরা এক ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে শুরু করেন। পুরো উপত্যকাটি মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, কাশ্মীরে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ভারতীয় রাষ্ট্রের সহিংসতার ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কখনোই নিন্দা করেনি। আর এভাবেই প্রদেশটিতে কাঠামোগত সহিংস পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সেখানে যা ঘটছে, তা মুছে ফেলা হচ্ছে।