ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার উত্তরাঞ্চলে সম্প্রতি বেশ কয়েকবার বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলের বিমানবাহিনী। অফিসিয়াল সূত্র মতে, এ হামলার পরিমাণ ছিল ৫০ বারেরও বেশি। বিমান হামলার প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু ছিল ওইসব এলাকা, যেগুলো হামাসের সামরিক শাখা আল কাসাম ব্রিগেডস ব্যবহার করে থাকে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র পিটার লার্নার জানান, হামাসের ছোড়া রকেট হামলার জবাব দিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণ করে হামাস।

লার্নার বলেন, গাজা উপত্যকা থেকে রকেট হামলার জবাবে ইসরাইলি এয়ার ফোর্স গাজার উত্তরাঞ্চলে হামাসের ঘাঁটিতে হামলা করে। এর আগে ইসরাইলের সেডেরত শহরে গাজা থেকে একটি রকেট হামলার পর এ হামলাগুলো চালায় ইসরাইল। অবশ্য ওই রকেট হামলার দায় আইসিস সমর্থিত গ্রুপ আহফাদ আল-সাহাবা স্বীকার করেছে। ইসরাইলের দাবি রকেট হামলাটি হয়েছে হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজা অঞ্চল থেকে। তাই এর দায় হামাসেরই।

এ ছাড়া গত মার্চে ইসরাইলের রকেট হামলায় ফিলিস্তিনি দুই শিশু নিহত হয়। ইসরাইলের এ ধরনের প্রাণঘাতী আক্রমণের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতকে আরো উসকে দেবে বলেই অনেক সমালোচক মন্তব্য করেন। এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে, এই সঙ্ঘাতের সমাধান কী, কোন পথেইবা এর অবসান ঘটবে? খোদ ইসরাইলের অনেক পর্যালোচক বলেন, গাজা উপত্যকা থেকে একটি রকেট হামলার মোক্ষম সুযোগটিই গ্রহণ করেছে ইসরাইল।

এর পেছনে কট্টর যুদ্ধবাজ ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাভিগদর লিবারম্যানের ইন্ধন রয়েছে। অনেকের মনেই এখন প্রশ্ন, একটি মাত্র বিক্ষিপ্ত ঘটনায় ইসরাইলের এ ধরনের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখানোর উদ্দেশ্যটা কী। হামাস মুখপাত্র ইসমাইল রিদওয়ান বলেন, ইসরাইলের এ ধরনের কট্টর আচরণে সমস্যার কোনো সমাধান আসবে না। গাজা উপত্যকায় নিয়ন্ত্রণ নতুন কোনো পরিবর্তন আসবে না। রিদওয়ান আরো বলেন, ইসরাইলের যুদ্ধংদেহি লাগামটা টেনে ধরার জন্য উচিত মিসরকে এগিয়ে আসা।

কারণ, ২০১৪ সালের আগস্টে কায়রোতে ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি হয়, তাতে কায়রোর বিশেষ ভূমিকা ছিল। ওই যুদ্ধবিরতিতে সম্মতির পর হামাস গাজা ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলের ওপর আর কোনো রকেট আক্রমণ করেনি। সম্প্রতি গাজা ভূখণ্ডের ওপর ইসরাইলের এই নজিরবিহীন বিমান হামলা এমন একসময়ে হলো, যখন ফিলিস্তিনে পৌর নির্বাচন আসন্ন।

ইতোমধ্যে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি দখলদার বাহিনী ফিলিস্তিন কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের এক হামাস প্রতিনিধিকে গ্রেফতার করেছে। ইসরাইলি বাহিনী তাকে এই অভিযোগে অভিযুক্ত করে যে, ওই প্রতিনিধি আগামী পৌর নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করার পরিকল্পনা করছিল। ইসরাইলি কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন যে, অক্টোবরের পৌর নির্বাচনে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে হামাসের আধিপত্য আরো জোরদার হবে। অন্য দিকে, হামাসের এই আধিপত্য ইসরাইলিদের জন্য সুখকর বিষয় নয়, ইসরাইল চায়, হামাস নয়, অন্য কোনো ফিলিস্তিনি দল নির্বাচনে আধিপত্য পাক।

কারণ গাজার পশ্চিম তীর হামাসের নিয়ন্ত্রণে এলে ফিলিস্তিনের অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠী হামাসের সাথে ঐক্য গড়ে তোলার সুযোগ পাবে। গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের বিমান হামলার আরো একটি উদ্দেশ্য হলো, বর্তমানে এখানে যে অবরোধ চলছে তা আরো জোরদার করা। অন্য দিকে, ফিলিস্তিনিরা চায় অর্থনৈতিক অবরোধকে অকার্যকর করে দেয়া। হামাসের সামরিক শাখা আল-কাসাম ব্রিগেডসের মুখপাত্র আবু ওবায়দা মন্তব্য করেন, শত্রুপক্ষের (ইসরাইল) নেতারা বারবার ভুল করে যাচ্ছেন।

অর্থনৈতিক অবরোধ জোরদার করতে তারা বারবার বিমান হামলা চালিয়ে নির্বুদ্ধিতারই পরিচয় দিচ্ছেন। গাজা ভূখণ্ডে ওয়ার্ল্ড ভিশন এবং ইউএনডিপি কর্মচারীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এভিগডর লিবারম্যান নিরস্ত্রীকরণ করতে পুনর্গঠন লিঙ্ক ধারণাটি পুনরুজ্জীবিত করার অনুরোধ জানিয়েছেন। অন্য দিকে, হামাস মনে করে, অবিরাম অবরোধ, বারবার বিমান আক্রমণ, অর্থবহ একটি পৌর নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাধা প্রদান প্রকৃতির কারণে সঙ্ঘাতকে আরো তীব্রতর করছে।

ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ইওসি মিলম্যান দি জেরুসালেম পোস্ট পত্রিকায় ইসরাইলের তীব্র সমালোচনা করে লেখেন, ইসরাইলের এ ধরনের ব্যাপক আক্রমণের অর্থ হলো তারা সমীকরণের পরিবর্তন চায়। তিনি উপসংহারে আরো কঠিন বক্তব্য ছুড়ে বলেন, ইসরাইলের এ ধরনের কর্মকাণ্ডে আরো একটি যুদ্ধের বীজ উপ্ত করা হলো। 

এসএ