বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা মুসলমানরা তাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধদের হত্যাকাণ্ড ও জুলুম নির্যাতনের বিষয়টি তদন্তের জন্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রতি আবেদন জানিয়েছে।
যদিও মিয়ানমার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য নয় এবং সে কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাদের হত্যা নির্যাতনের বিষয়ে তদন্ত করার অধিকার তাদের নেই তবুও ওই আদালতের কয়েকজন অ্যাটর্নি জেনারেল বাংলাদেশের মাধ্যমে তদন্ত শুরু করার জন্য আবেদন জানিয়েছেন। কারণ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য।
যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, জাতিগত শুদ্ধি অভিযান ও আগ্রাসনের ঘটনাগুলো তদন্ত করে থাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। এ কারণে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ইতিহাসের জঘন্যতম যে বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটে গেল বা এখনো হত্যাকাণ্ড চলছে সে ব্যাপারে অপরাধ আদালতসহ আন্তর্জাতিক সব সংস্থা তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে সকলের প্রত্যাশা।
ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ অ্যান্থেনিও কার্তালুসি বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান বলতে যা বোঝায় তা মিয়ানমারের মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন প্রদেশে ঘটেছে।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধরা জাতিগত শুদ্ধি অভিযানকে তাদের একমাত্র লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর হত্যাকাণ্ড ও লাখ লাখ মানুষকে শরণার্থীতে পরিণত করার বিষয়ে তদন্তের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কাছে এমন সময় আহ্বান জানানো হল যখন মিয়ানমার সরকার নানা কৌশল ও ছলচাতুরির মাধ্যমে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর চেষ্টা করছে। এই কৌশলের অংশ হিসেবে মিয়ানমার গত বছর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে শরণার্থী প্রত্যাবাসন বিষয়ে চুক্তি করে। এ ছাড়া, সম্প্রতি জাতিসংঘের সঙ্গেও মিয়ানমার এ ধরণের একটি লোক দেখানো চুক্তি করেছে।
শরণার্থী প্রত্যাবাসন বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে প্রায় ৬ মাস আগে সমঝোতা হলেও এখন পর্যন্ত মিয়ানমার সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি। অর্থাৎ শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার কোনো উদ্যোগই নেয়নি।
নিউইয়র্ক ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মহাসচিব বিল ফ্রেইক বলেছেন, "রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার আগে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির জন্য এখনো অনেক কাজ বাকি।"
তিনি বলেন, "আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের তত্বাবধানে ফিরিয়ে নেয়া শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও প্রাথমিক প্রয়োজনগুলো নিশ্চিত করতে হবে।"
ধারণা করা হচ্ছে, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলে গণহত্যা তদন্তের বিষয়ে সময় ক্ষেপণের কৌশল নিয়েছে। যাতে এ সুযোগে রাখাইন রাজ্য থেকে মুসলমানদেরকে পুরোপুরি বের করে দিয়ে ওই এলাকার জনসংখ্যার কাঠামোয় বৌদ্ধদের অনুকূলে পরিবর্তন আনা যায়।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনী ও উগ্র-বৌদ্ধরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর ধর্ষণ-গণহত্যা-অগ্নিসংযোগ শুরু করলে সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে মুসলমানরা। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী- গত বছরের ২৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ৬ লাখ ৮০ হাজার। তার আগে বিভিন্ন সময় সেনাবাহিনী ও উগ্র-বৌদ্ধদের নির্যাতনে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়ে আছে ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে,বর্মী সৈন্যরা গ্রামবাসীদের সাথে নিয়ে কিভাবে রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা চালিয়েছে। রয়টার্স বলছে, রাখাইনের উত্তরাঞ্চলীয় ইন দিন গ্রামে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর গণহত্যার ঘটনা ঘটেছিলো। এই গ্রামে ১০ জন রোহিঙ্গাকে হত্যার বিষয়ে তাদের দুই সাংবাদিক ওয়া লো এবং চ সো উ-কে সেখানে তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে বলা হয়, ওই গ্রামে অভিযানের সময় রোহিঙ্গা পুরুষদের একটি দল নিজেদের জীবন বাঁচাতে একটি জায়গায় গিয়ে জড়ো হয়। তখন ওই গ্রামের কয়েকজন বৌদ্ধ পুরুষ একটি কবর খনন করার নির্দেশ দেন। তারপর ওই ১০ জন রোহিঙ্গা পুরুষকে হত্যা করা হয়। বৌদ্ধ গ্রামবাসীরা অন্তত দু’জনকে কুপিয়ে এবং বাকিদেরকে সেনাবাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে।
এমবি





