বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যকে অপ্রত্যাশিত ও খুবই দুঃখজনক বলে অভিহিত করেছেন বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিকরা। তারা বলেছেন, বাংলাদেশ একটি শান্তিপূর্ণ দেশ।

ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ নিরসনে বাংলাদেশ সব সময় সহায়তা করে থাকে। কিন্তু প্রতিমন্ত্রী হংসরাজ আহির বক্তব্য কোনোভাবেই কেউ মেনে নিতে পারছেন না।

প্রসঙ্গত, ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হংসরাজ আহির বলেছেন, বাংলাদেশ ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। পাকিস্তান ও চীনের চেয়ে বাংলাদেশই বড় চ্যালেঞ্জ।

বৃহস্পতিবার আসাম সফরে গিয়ে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবিষয়ক এক বৈঠকে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, অনুপ্রবেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করছে। একমাত্র স্মার্ট প্রযুক্তিই আমাদের এই অনুপ্রবেশ দমনে সহায়তা করতে পারে।

ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এ মন্তব্যে বাংলাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সবাই জানতে চান, ভারতের মনি্ত্রসভার একজন সদস্য কেন এমন মন্তব্য করলেন। এ কথা বলে আসলে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন।

জানতে চাইলে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমশের মবিন চৌধুরী বলেন, 'ভারতের কোনো প্রতিমন্ত্রীর মুখে এমন মন্তব্য অপ্রত্যাশিত, অমূলক। বাংলাদেশ একটি শান্তিপূর্ণ দেশ।

ভারতসহ সব দেশ, বিশেষ করে প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা নিয়ে যে কোনো উদ্বেগ নিরসনে বাংলাদেশ ইতিবাচক ছিল, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। আমি আশা করব, ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এ মন্তব্য তার ব্যক্তিগত অভিমত হবে, ভারতের রাষ্ট্রের বক্তব্য হবে না।'

বাংলাদেশের আরেক সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, 'আমাদের মনে রাখতে হবে, ভারতে মুসলিমবিদ্বেষী দল ক্ষমতায় আছে। তাদের দেশে যে কোনো নিয়োগে আরএসএসের প্রভাব থাকে।

উত্তরপ্রদেশ তার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত। ভারতের মন্ত্রিসভা যদি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য খণ্ডন না করে মেনে নেয় তবে ধরে নেব যে, এটা তার ব্যক্তিগত মতামত নয়, সরকারের মনোভাব। এমন হলে তা হবে খুবই দুঃখজনক।'

কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, ভারতের মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীল একজন সদস্যের কাছ থেকে আসা এমন মন্তব্য ভিন্ন বার্তার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে স্ববিরোধিতার প্রশ্ন তো বটেই। কেননা বাংলাদেশ সম্পর্কে খোদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের অবস্থান ও বক্তব্য বরাবরই খুব ইতিবাচক। সেখানে এ বক্তব্য ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতমুখী।

সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যৌথভাবে বন্ধন এক্সপ্রেস নামের নতুন ট্রেন উদ্বোধন করেন। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। প্রত্যেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করেন।

এর আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ঢাকা সফরকালে বলেন, 'ভারতের নীতি হল প্রতিবেশী প্রথম। আর প্রতিবেশীদের মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম।' অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা সফরে আসেন ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। ৪ অক্টোবর বাংলাদেশকে দেয়া ঋণ সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে দেয়া এক লিখিত বিবৃতিতে বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আজ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং অন্যান্য দেশের জন্য অনুসরণযোগ্য একটি মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে।'

বিশ্লেষকদের মতে, এমন নিবিড় সম্পর্কের মধ্যে ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এমন বক্তব্য বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে রীতিমতো হতবাক করেছে।

কেউ কেউ বলছেন, বিষয়টি ভারতের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে দ্রুত স্পষ্ট করা না হলে ঢাকা সম্পর্কে নয়াদিল্লির প্রকৃত অবস্থান নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হবে।

তারা মনে করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। এজন্য এ দেশের প্রতিটি নাগরিক চিরকৃতজ্ঞ। তাই সবচেয়ে বন্ধুপ্রতিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি এখানকার গণতন্ত্র, রাজনীতি ও অর্থনীতিসহ সার্বিক উন্নয়নে ভারতের অবস্থান হতে হবে খুবই স্বচ্ছ।

উল্লেখ করা যেতে পারে, ২০১৫ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরে আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ সময় ৭ জুন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত সুধী সমাবেশে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, 'উন্নতির জন্য বাংলাদেশকে শুধু পাশে নয়, সঙ্গে নিয়ে চলব। সমস্যা মোকাবেলায় একসঙ্গে লড়ব। আজ আমরা একসঙ্গে চলি, কাল একসঙ্গে দৌড়াব।' তিনি আরও বলেন, ‘দুদেশের জন্য একই স্বপ্ন দেখি।'

কিন্তু গেল বৃহস্পতিবার ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হংসরাজ আহির আসাম সফরে গিয়ে যা বলেছেন তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির বক্তব্য পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

এমনিতেই রোহিঙ্গা ইসু্যতে ভারতের প্রকৃত অবস্থান নিয়ে কূটনৈতিক বিশে্লষকদের অনেকে এখনও দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছেন। ত্রাণ পাঠানোসহ নানাভাবে ভারত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ালেও দেশটিতে সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যা বলেছেন- সেটিও তারা ভুলতে চান না।

মিয়ানমার সফরকালে ৬ সেপ্টেম্বর নেপিদোতে অং সান সু চির সঙ্গে বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সু চিকে সমর্থন জানিয়ে মোদি বলেন, 'রাখাইন রাজ্যে উগ্রপন্থী সহিংসতা নিয়ে আমরা আপনার উদ্বেগের সঙ্গে সহমত পোষণ করি, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নিরপরাধ জীবন যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাতে।'

পরবর্তিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ আনিত প্রস্তাবে ভোট দানে বিরত থাকে ভারত। এ নিয়েও বিশ্লেষক মহলে নানা টানাপোড়েন মন্তব্য শোনা যাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভূরাজনৈতক কারণ ও স্বার্থে হতে পারে নরেন্দ্র মোদির এ বক্তব্য কৌশলগত। কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশ সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হংসরাজ আহির এর উল্লেখিত বক্তব্য কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়।