যুক্তরাষ্ট্র সফররত ইহুদিবাদী ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইরানকে সন্ত্রাসীদের সমর্থক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি তার ভাষায় দাবি করেছেন, ইরানের নেতৃত্বে এ অঞ্চলের শিয়া ইসলামী মিলিশিয়াদের পাশাপাশি  উগ্র তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএল বা দায়েশ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে দখল করে নিতে চায়।

নেতানিয়াহু আরো বলেছেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার সঙ্গে আমার মতপার্থক্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত পরমাণু চুক্তি হয়েছে। তবে এ চুক্তি যাতে ইরান লঙ্ঘন না করে সেজন্য নজর রাখা হচ্ছে বলে নেতানিয়াহু মন্তব্য করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের পরমাণু চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ কিংবা সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর এসব বক্তব্য খুবই হাস্যকর। কারণ সন্ত্রাসবাদের মূল পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এরই মধ্যে কুখ্যাতি অর্জন করেছেন। অথচ তিনিই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সৃষ্টির জন্য ইরানকে অভিযুক্ত করেছেন।

ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের পরমাণু সমঝোতা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মতবিরোধ নিরসনের জন্য যারা যৌক্তিক আলোচনার পক্ষপাতী এবং শান্তি চায় এটা তাদের জন্য আনন্দদায়ক। কিন্তু যারা শান্তি চায় না এটা তাদের জন্য বেদনাদায়ক। এ কারণে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের পরমাণু সমঝোতার বিরোধিতা করে একে বিপদজনক বলে অভিহিত করে আসছেন। তিনি ইরান বিরোধী বক্তব্য দিয়ে জনমতকে বিভ্রান্ত করা এবং সত্যকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছেন। এর মাধ্যমে নেতানিয়াহু কয়েকটি উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা করছেন।

প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পরমাণু অস্ত্রধর এবং এনপিটি চুক্তিতে সই করতে নারাজ ইসরাইলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হাস্যকর কিছু অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক সমাজের চাপ ইরানের দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে চাপ সৃষ্টির আশঙ্কায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নানা ছল চাতুরির আশ্রয় নিয়েছেন। আমেরিকা এবং ইসরাইল উভয়েই মধ্যপ্রাচ্যকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার বিরোধী।

নেতানিয়াহুর ইরান বিরোধী বক্তব্যের পেছনে দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে, তিনি বিভ্রান্তি তৈরি করে আমেরিকার কাছ থেকে সব রকম সুযোগ সুবিধা আদায় করে নেয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি বহুবার ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন। কারণ ইসরাইলের কর্মকর্তারা এটা ভালো করেই জানেন যে, পরমাণু চুক্তি বাস্তবায়িত হলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে ইসরাইল। ইসরাইল আমেরিকার কাছ থেকে অফেরতযোগ্য অর্থসহ প্রচুর অস্ত্র পেয়ে থাকে। নেতানিয়াহু এবারও ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে এসব সাহায্য পাওয়ার চেষ্টা করছেন। অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যে অত্যন্ত বিশ্বস্ত হিসেবে দখলদার ইসরাইলকে টিকিয়ে রাখার জন্য আমেরিকাও তাদেরকে নানা রকম সুযোগ সুবিধা দিতে বাধ্য।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ইরান বিরোধী বক্তব্যের তৃতীয় কারণটি হচ্ছে, পাশ্চাত্য বিশেষ করে আমেরিকার বিপর্যয়র অবস্থার জন্য সৃষ্ট উদ্বেগ। কারণ নেতানিয়াহু এ জন্য চিন্তিত যে, আমেরিকার সব হুমকি, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সত্ত্বেও ইরানের প্রতিরোধের কারণে শেষ পর্যন্ত মার্কিনীরা ইরানের পরমাণু অধিকার মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে পাশ্চাত্যের পরমাণু সমঝোতার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও আমেরিকার প্রভাব অনেকটাই খর্ব হয়েছে। বিশেষ করে এ অঞ্চলে ইসরাইল ও আমেরিকার আগ্রাসী নীতি বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এরই আলোকে ইসরাইল-মার্কিন লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে আইএসআইএলের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতার বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ ইসরাইলের বিরুদ্ধে যারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে তাদের বিরুদ্ধেই এসব সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দেয়া হয়েছে এবং আইএসআইএল ইসরাইল কিংবা আমেরিকার জন্য মোটেও হুমকি নয়। এরই আলোকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর ইরান বিরোধী বক্তব্যকে মূল্যায়ন করতে হবে।
রেডিও তেহরান থেকে/এমএ