সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনে ব্যাপক সাফল্যের পর বাবরি মসজিদ ভাঙা মামলা ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)’র জন্য বড় রকমের ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। দেশটির মুসলমানদের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টিকারী এই মামলা ২৫ বছর ধরে আদালতে ঝুলছে।

উত্তর প্রদেশের মতো রাজ্য যেখানে জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ মুসলমান সেখানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ের পর বিজেপি মামলার রায় প্রভাবিত করতে পারে এমন আশংকাও করছেন কেউ কেউ।

১৯৯২ সালে উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় ষোড়শ শতকে মোগল বাদশাহ বাবরের নির্মিত ‘বাবরি মসজিদ’ নামে পরিচিত মসজিদটি বিজেপি-পন্থী উগ্র কর্মীরা গুড়িয়ে দেয়। এই স্থানটিকে তারা দেবতা রামের জন্মস্থান বলে দাবি করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় দুই হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। নিহতদের বেশিরভাগ ছিলো মুসলমান।

এই ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলার শুনানি আগামী ৬ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টে অনুষ্ঠিত হবে। এই মামলায় লাল কৃষ্ণ আদভানিসহ বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।

বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটন ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দায়ের করা মামলা পুনরুজ্জীবিত করা হবে কিনা তা নিয়ে এই শুনানি। ২০০১ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট এই মামলা খারিজ করে দেয়। এর ১০ বছর পর ২০১১ সালে দেশটির সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। সে সময় মনমোহন সিং-এর নেতৃত্বে কংগ্রেস ছিলো ভারতের ক্ষমতায়।

অনেক সমালোচক সিবিআইকে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘খাঁচার পাখি’ বলে মনে করেন। সরকারি এই সংস্থাটি এখন বিজেপি সরকারের আমলে আজ্ঞাবহ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তাদের ধারণা।

বিজেপি নেতাদের ফের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে বলে যদি শীর্ষ আদালত রায় দেয় তাহলে তা হলে ‘গেরুয়া’ দলটিকে বড় রকমের বেকায়দায় পড়তে হবে বলে সম্প্রতি এক নিবন্ধে লিখেছে হংকং-ভিত্তিক পত্রিকা এশিয়া টাইমস। এটা ব্যক্তিগতভাবে আদভানির জন্য বড় আঘাত হতে পারে।

গত ৮ মার্চ গুজরাটের সোমনাথে এক দলীয় বৈঠকে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ  ও প্রধানমন্ত্রী মোদি দেশের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার নাম প্রস্তাব করেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির মেয়াদ ২৪ জুলাই শেষ হচ্ছে।

এশিয়া টাইমসের নিবন্ধে বলা হয়, মামলার বিচার নতুন করে শুরু হলো তা বিজেপি’র আরো বেশ কিছু শীর্ষ নেতাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে। এদের মধ্যে রয়েছে এ বছর দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব ‘পদ্মভূষণ’-এ ভূষিত ড. মুরলি মনোহর যোশি এবং কেন্দ্রিয় পানি সম্পদ মন্ত্রী উমা ভারতী।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর যে দিনটিতে বিজেপি-পন্থী কর সেবকরা বাবরি মসজিদ ভাঙ্গছিলো তার ২০০ মিটার দূরে ‘রাম কথা কুঞ্জ’ নামে তৈরি করা একটি মঞ্চের ওপর বিজেপি’র যে ১২ জন নেতা অপেক্ষা করছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন মোদি, যোশি ও উমা।

শুরুতে সিবিআই মসজিদ ভাঙ্গায় অংশ নেয়া করসেবক ও বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে একযোগে মামলা দেয়। বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকানোর অভিযোগ আনা হয়।

তবে ২০০১ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের লাক্ষৌ বেঞ্চ শুধু যারা মসজিদ ভাঙ্গার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলো তাদের ছাড়া বাকিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খারিজ করে দেয়। হাইকোর্টের এই রায় ২০১১ সালে সিবিআই সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে। সিবিআই জানায়, লাক্ষৌ বেঞ্চ আদভানি ও অন্যদের রক্ষার জন্য একটি ‘কৃত্রিম পার্থক্য’ তৈরি করেছে।

ভারতের প্রধান বিচারপতি জগদিশ সিং খেহারিন বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা নিয়ে বিরোধ আদালতের বাইরে মিমাংসা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর কয়েক দিন পরেই সুপ্রিম কোর্ট বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মামলা পুনরুজ্জীবিত করার শুনানি গ্রহণের নির্দেশ দেয়।

মামলাটি শুধু সুপ্রিম কোর্টেই ছয় বছর ধরে ঝুলছে। ২০১০ সালে এলাহাবাদ কোর্টের আদেশে বাবরি মসজিদের মূল গম্বুজের নিচে হিন্দুদের তৈরী করা অস্থায়ী মন্দিরে পূজা করারও অনুমতি দেয়া হয়। তবে সুপ্রিম কোর্ট এ আদেশ স্থগিত করে।

বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রিয় সরকার ও এর পিতৃ সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ প্রধান বিচারপতির আলোচনার মাধ্যমে সমাধান প্রস্তাব স্বাগত জানালেও মুসলমানদের সুন্নি ওয়ক্ফ বোর্ড ও অল ইন্ডিয়া মুসলিম পারসনাল ল’ বোর্ড তা প্রত্যাখ্যান করে। অতীতে এ ধরনের অনেক আলোচনায় কোন কাজ হয়নি বলে মুসলমানদের অভিযোগ।

ঐতিহাসিক তথ্য উপাত্ত, ভূমি রেকর্ড ও পুরাতাত্তি¡ক প্রমাণের ভিত্তিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টকে এ বিরোধের একটি সমাধান বের করতে হবে। তবে, ধর্মীয় বিশ্বাস ও দুই পক্ষের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের চাপটিকে আদালত কিভাবে মোকাবেলা করবে তা এখন দেখার বিষয়।(southasianmonitor)

এমবি