ইরানের ওপর থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর দেশটির অর্থনীতিতে পড়েছে ইতিবাচক প্রভাব। বিশেষ কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে ব্যাংকিং ও আমদানি-রপ্তানি খাতে। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর প্রথম দিনেই ১০০০ এর বেশি লেটার অব ক্রেডিট বা এলসি খোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের চেম্বার অব কমার্সের প্রধান মোহসেন জালালপুর।
তিনি জানান, প্রায় দুই মাস আগে ইরান চেম্বার অব কমার্স, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং শিল্প, খনি ও বাণিজ্য বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রথম দিনেই এসব এলসি খেলা হবে বলে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও সমস্ত প্রক্রিয়া ঠিক করে রেখেছিল।
প্রথম দিনে যেসব এলসি খোলা হয়েছে তার মূল্যমান ১০ কোটি ডলার। এর পাশাপাশি ‘সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিনান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন’ বা সুইফট-এর সঙ্গে নতুন করে ইরান সংযুক্ত হয়েছে।
সুইফটের সদস্যপদের জন্য ইরানের সোমবার আবেদন করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তিনি জানান, দুই সপ্তাহের মধ্যে সুইফটের সদস্যপদ পাওয়া সম্ভব এবং তা ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকেই হয়ে যাবে।
এদিকে, ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনা দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রিসভার সদস্য অথবা ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল ইরানে আসছে। কোনো কোনো দেশের সঙ্গে হচ্ছে আর্থিক ও বাণিজ্যিক ইস্যুতে নানা চুক্তি।
এরইমধ্যে ইরান সফর করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এরমধ্যে চীনা প্রেসিডেন্ট সফরের সময় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাণিজ্য চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। আগামী দশ বছরের মধ্যে ইরান ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে ৬০০ বিলিয়ন ডলারে নেয়া হবে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট নিজেও ইউরোপ সফরে বেরিয়েছেন। সফরের প্রথম দিনে ইতালির সঙ্গে সাড়ে ১৮শ কোটি ডলারের বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছে।
এর পাশাপাশি রাজধানী তেহরানে প্রায় প্রতিদিন চলছে নানা রকমের ব্যবসা-সংশ্লিষ্ট সম্মেলন ও সেমিনার। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এক সম্মেলনে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ওয়ালিউল্লাহ সাইফ জানিয়েছেন, হাজার হাজার এলসি খোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

তিনি জানান, বিভিন্ন শিল্পের জরুরি কাঁচামাল আমদানির জন্য এসব এলসি খোলা হচ্ছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে এসব কাঁচামাল এসে পৌঁছালে দেশে পণ্যের উৎপাদনে বিশেষ গতি আসবে বলে তিনি আশা করেন।
এছাড়া, ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি তেহরানে রাজধানী তেহরানে ‘সিএপিএ ইরান অ্যাভিয়েশন সামিট-২০১৬ অনুষ্ঠিত হয়েছ। সিএপিএ হচ্ছে বিশ্বব্যাপী বিমান সেবার ক্ষেত্রে একটি সংস্থা যা স্বতন্ত্র বিমান মার্কেটে বুদ্ধি-পরামর্শ, বিশ্লেষণ ও তথ্য সরবরাহ করে থাকে।
সম্মেলনের অবকাশে আমেরিকার হেইকো অ্যারোস্পেস পার্টস গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট জিম ও’ সুলিভ্যান বলেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আঞ্চলিক বিমান পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে সক্ষম। বিশাল এলাকার কেন্দ্রস্থলে ইরানের অবস্থান হওয়ায় তেহরানের হাতে এ সুযোগ রয়েছে।
জিম ও’ সুলিভ্যান বলেন, তার কোম্পানি ইরানের বাজারে বিনিয়োগের বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখছে। তেহরানে অনুষ্ঠিত সিএপিএ সম্মেলনে বিশ্বের ৩৫টি দেশের ৮৫টি বিমান প্রস্তুতকারক কোম্পানির ১৬০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে ইরানের সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রী আব্বাস আখুন্দি বলেছেন, ইহুদিবাদী ইসরাইল ছাড়া বিশ্বের সব দেশের বিমান কোম্পানির কাছ থেকে তেহরান সহযোগিতা নিতে প্রস্তুত রয়েছে।

ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার দিনই (রোববার) ইরানের স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন বেড়ে যায়। ওইদিন সার্বিক শেয়ার সূচক শতকরা ৭ ভাগ বাড়ে। এর বিপরীতে সৌদি আরবসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর শেয়ার সূচকে বড় ধরনের পতন হয়।
গত ১২ বছরের মধ্যে এটি ছিল বড় ধরনের দরপতন। এর বাইরে তেল উৎপাদন প্রতিদিন পাঁচ লাখ ব্যারেল বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে ইরান সরকার।
অর্থনৈতিক গতি সৃষ্টির এই অবস্থায় মঙ্গলবার রাজধানী তেহরানে একটি অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে দেয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি বলেছেন, “এটি কেবল শুরু, অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই গতির সঙ্গে আমাদের অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে, আমাদের সামনে অনেক পথ বাকি।” একইসঙ্গে প্রেসিডেন্ট রুহানি পরমাণু আলোচনা চলার সময় ধৈর্য ধরার জন্য ইরানি জনগণের প্রশংসা করেন।
প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে ছয় জাতিগোষ্ঠীর যাতে চুক্তি না হয় সে জন্য প্রতিবেশী কোনো কোনো মুসলিম দেশ অর্থও ব্যয় করেছে। প্রেসিডেন্ট রুহানি জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, ইরান হবে এ অঞ্চলের উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি।
নিষেধাজ্ঞা পূর্ববর্তী ইরানের সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী ইরানের পার্থক্য হবে ব্যাপক। প্রতিরোধমূলক অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
প্রেসিডেন্ট রুহানি দেশে শতকরা ৮ ভাগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতে ৫,০০০ কোটি ডলার বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে জানান।
তিনি ব্রিটেনের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর কথাও বলেছেন এবং ব্রিটিশ বিনিয়োগও প্রত্যাশা করেছেন। গত মঙ্গলবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে এক টেলিফোন সংলাপে ড. রুহানি এ আশা করেন।
জবাবে ক্যামেরন বলেছেন, ইরানের সঙ্গে লন্ডন তার ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে প্রস্তুত রয়েছে। এরইমধ্যে দু দেশের যৌথ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
তুরস্ক ইরানে আগে থেকেই পোষাক রপ্তানি করত। এখন সে পরিমাণ বাড়িয়ে তোলার জন্য দেশটি জোরালো উদোগ নিয়েছে। বাংলাদেশের পোষাক প্রস্ততকারকরা ইরানের বাজারে সহজেই প্রবেশ করতে পারেন।
ইরানরে বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পোষাকের দারুন কদর রয়েছে; নিষেধাজ্ঞা থাকার সময় নানা বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে ইরানে আসা বাংলাদেশি পোষাক এরইমধ্যে ইরানের ব্যবসায়িদের নজর কেড়েছে। ইরানে যখন অর্থনীতির এমন গতি তখন সুখবর নেই শুধু একটি খাতে। সেটি হচ্ছে মুদ্রার দরপতন।
২০১২ সালে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর ইরান সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত ডলার, ইউরো ও ব্রিটিশ পাউন্ডসহ বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়ন করে। তাতে দ্রুতই পণ্য ও মুদ্রাবাজার কিছুটা অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। পরে অবশ্য ইরানি রিয়ালের মানের আরো পতন ঘটানো হয়েছে। রপ্তানি আয় ঠিক রাখতে সরকার এ কাজ করেছে বলে মনে করা হয়।
গত কয়েক বছরে এ অবস্থার সঙ্গে অনেকটা তাল মিলিয়ে চলছে দেশের জনগণ ও অর্থনীতির সার্বিক কর্মকাণ্ড। তবে অনেকের ধারণা ছিল ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে মুদ্রার দরপতন বন্ধ হবে এবং রিয়াল তার প্রকৃত অবস্থায় ফিরে যাবে।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর গত গত কয়েকদিনে এর কোনো লক্ষণ দেখা যায় নি বরং নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার একদিন পর ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের আরো দরপতন হয়েছে যা ছিল এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন।
ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার দিন সকালে এ প্রতিবেদক তেহরানের একজন ট্যাক্সি চালকের কাছে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিলেন। জবাবে ওই চালক বলেছিলেন, “এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।
নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর জনজীবনে তার কী ধরনের সুফল পড়ে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে ডলারের দাম আরো বাড়তে পারে বলে মনে হয়।” গত কদিনের ঘটনাবলীতে দেখা যাচ্ছে- তেহরানের সে ট্যাক্সি চালকের কথা বেশ ফলেছে। অবশ্য, ডলারের দাম বাড়লেও ইরানের জনগণের জীবনে তার বড় কোনো প্রভাব পড়ে নি। সবকিছু সমন্বয় করেই এগিয়ে যাচ্ছেন এখানকার লোকজন।
এমকে





