প্রধানমন্ত্রী হতে নরেন্দ্র মোদীর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে না তৃণমূল কংগ্রেস৷ বৃহস্পতিবার রাতে এক টেলিভিশন সাক্ষাত্‍কারে দলের এই অবস্থানের কথা জানালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ গত মাসে ব্রিগেডের সভায় মোদী এবং বিজেপির নাম না করে মমতা সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন৷ তারপরও সেই ব্রিগেডেই বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদী দিল্লি দখলের লক্ষ্যে খোলাখুলি মমতার সমর্থন চান৷ ফলে জল্পনা শুরু হয় মোদী-মমতা সম্পর্ক ঘিরে৷
বৃহস্পতিবার 'টাইমস নাও'-কে দেওয়া সাক্ষাত্‍কারে তৃণমূল নেত্রী এ ব্যাপারে যাবতীয় জল্পনাতেই জল ঢেলে দিয়েছেন৷ মোদীর নেতৃত্বে সরকার গড়তে বিজেপি তৃণমূলের সমর্থন চাইলে তিনি কী করবেন, এই প্রশ্নে মমতার স্পষ্ট জবাব, 'না, না আমি ওদের বিরুদ্ধে৷ আমি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মানতে পারি না৷ আমরা বিজেপি, কংগ্রেস এবং সিপিএম, এই তিন পক্ষের বিরুদ্ধেই লড়াই করছি৷'
জাতীয় রাজনীতিতে তার ব্যক্তিগত প্রত্যাশা নিয়ে প্রশ্নের জবাব মুখ্যমন্ত্রী একপ্রকার এড়িয়েই গিয়েছেন৷ বরং বলেছেন, মায়াবতী, মুলায়ম সিং, জয়ললিতা, নীতীশ কুমার-- যে কেউ প্রধানমন্ত্রী হলে তার আপত্তি নেই৷ তবে সবই নির্ভর করবে ভোটের ফলাফলের ওপর৷ মমতা বলেন, 'এঁদের নিয়ে আমার কোনও সমস্যা নেই৷ আগে দেখতে হবে, কার হাতে কত আসন আছে৷ আমার কাছে বিবেচ্য তিনটি বিষয়, এক, রাজনৈতিক স্থায়িত্ব, দুই, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব, তিন, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন৷ এখানে কিছু সংস্কার প্রয়োজন৷' মুখ্যমন্ত্রী এই প্রসঙ্গেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ভোটদানে সচিত্র পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার দাবি তিনিই তুলেছিলেন৷
এই নির্বাচনে তৃণমূল যে ফেডারেল ফ্রন্টের কথা বলেছে, তা নিয়ে বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় নেত্রীকে৷ ফেডারেল ফ্রন্টের ব্যাপারে কোনও দলই আগ্রহ দেখায়নি, এই বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, তথাকথিত তৃতীয় বিকল্পের শরিক যে দলগুলি, তাদের অনেকের সঙ্গেই তার যোগাযোগ রয়েছে৷ যদিও বামেদের উদ্যোগে এই তৃতীয় বিকল্পকে 'টি পার্টি' বলে কটাক্ষ করেছেন৷
'টি পার্টি'র শরিকদের কারও সঙ্গে কি তার যোগাযোগ আছে? মমতার জবাব, 'অবশ্যই৷ দেখতেই পাচ্ছেন জোটের কী হাল! ওরা স্রেফ একসঙ্গে বসছে৷' মমতা আরও বলেন, 'আমাদের সঙ্গে ওই দলগুলিরও যোগাযোগ আছে৷ আমি নিজের মত কোনো দলের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী নই৷
বিজেপি সম্পর্কে কঠোর অবস্থানের কথা ঘোষণা করে এবং তৃতীয় ফ্রন্টের শরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কথা প্রকাশ্যে এনে মমতা এ রাজ্যে বাম ও কংগ্রেসের আক্রমণকে অনেকটাই ভোঁতা করে দিতে পারবেন বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছেন৷ ভোটের পর তৃণমূল বিজেপির হাত ধরবে না, মমতা এ কথা স্পষ্ট করে বলছেন না বলে প্রচার শুরু করেছে সিপিএম-কংগ্রেস৷ দু'দলই চাইছিল, মমতা-মোদী বোঝাপড়ার কথা প্রচার করে সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলের কাছ থেকে অনেকটাই ভাঙিয়ে আনা যাবে৷ এই সাক্ষাত্‍কারের পর তাদের সেই কৌশল কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে সংশয় আছে৷
তৃতীয় ফ্রন্টের কথা প্রচারে এনে সিপিএম-সহ বামপন্থীরা জাতীয় রাজনীতিতে তাদের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরার চেষ্টা চালাচ্ছে৷ ভোটের পর সেই বিকল্প ফ্রন্টের শরিকদের সঙ্গে প্রয়োজনে তিনি বোঝাপড়া করতে পিছপা হবেন না, তৃণমূল নেত্রীর এই ঘোষণা বামেদের কিছুটা বিপাকে ফেলল রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত৷
বিজেপি সম্পর্কে তার অবস্থানের কথা খোলাখুলি জানাতে গিয়ে মমতা গুজরাত দাঙ্গার প্রসঙ্গ টেনেছেন৷ ২০০২-এ সেই দাঙ্গার সময় তৃণমূল মোদির বিরোধিতা করেনি বলে সিপিএম এবং কংগ্রেস অভিযোগ করে আসছে৷
এদিন তৃণমূল নেত্রী যাবতীয় অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, গুজরাতে দাঙ্গা শুরুর পর তৃণমূলই প্রথম সেখানে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল৷ সংসদেও তিনি মোদীর ভূমিকার সমালোচনা করেছিলেন বলে মুখ্যমন্ত্রী জোরালো দাবি তুলেছেন৷ তার বক্তব্য, 'সংসদের নথিপত্র দেখলেই এই বক্তব্যের সত্যতা জানা যাবে৷' মমতাকে প্রশ্ন করা হয়, নরেন্দ্র মোদীকে তিনি কি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মুখ বলে মনে করেন? মুখ্যমন্ত্রীর জবাব, 'গুজরাতে যা হয়েছিল, তা কী? কেন এই দাঙ্গা?
উত্তরপ্রদেশ, অসমেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে৷ গুজরাটে যা হয়েছে, তা আর কোথাও হোক, চাই না৷ সেই কারণেই আমরা সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরোধিতা করছি৷' এরপরও তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, 'যদি নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রী হতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য তৃণমূলের সমর্থন প্রয়োজন হয়, আপনি কি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন?' মমতা সাফ জানিয়ে দেন, 'আমরা তা করব না৷'
[b]ঢাকা, ৭ মার্চ (টাইমনিউজবিডিডটকম) // ইএইচ[/b]