নিউইয়র্কে জনসাধারণের নিরাপত্তা, মানবাধিকার সুরক্ষা, মুসলিম কমিউনিটির ক্ষমতায়ন ও হেইট ক্রাইম বিরোধী সোচ্চার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার ও মতবিনিময় সভা। হেইট ক্রাইমসহ যে কোন ক্রাইম ঘটার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানানোর পরামর্শ দেয়া হয় বিশেষ এই সেমিনার থেকে।


বাঙালী অধ্যুষিত ব্রঙ্কসে পার্কচেস্টারের পারডি স্ট্রিটের এমএস ১২৭ অডিটরিয়ামে গত সোমবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় এ গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার। ’পাবলিক সেইফটি এমপাওয়ারমেন্ট ফোরাম উইথ দ্য মুসলিম কমিউনিটি  ‌‌'এসেইফারব্রঙ্কস’ শিরোনামে এ সেমিনারের বিষয়বস্তু ছিল ’এনগেইজ ইন এ ডায়লগ উইথ এনওয়াইপিডি অ্যান্ড এনওয়াইসি গভার্ণমেন্ট লিডার্স এবাউট পাবলিক সেইফটি, হিউম্যান রাইটস, রিপোর্টিং বেইজড ইসিডেন্টস, অ্যান্ড রিসিভ এ ডাইরেক্টরী অব সিটি সার্ভিসেস।’


নিউইয়র্ক সিটি মেয়র অফিসের কমিউনিটি এ্যাফিয়ার্স ইউনিটের সিনিয়ার এডভাইজার ড. সারা সাইয়েদের সভাপতিত্বে এবং এই ইউনিটের সাউথ ব্রঙ্কস ব্যুরো ডাইরেক্টর ইলভিন গারসিয়ার পরিচালনায় সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ৪৩ পুলিশ প্রিসেনক্টের ইনেসপেক্টর কমান্ডিং অফিসার ফাস্টো বি পিসারডো, নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের হেইট ক্রাইমস টাস্কফোর্সের সার্জেন্ট কেভিন সি লোনারজেন, নিউইয়র্ক সিটি মানবাধিকার রাইটসের ল এনফোরসমেন্ট ব্যুরোর এসিসটেন্ট কমিশনার সপ্না ভি রাজ, নিউইয়র্ক সিটি এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের ফ্যামিলি রিডারশীপ কোঅর্ডিনেটর মারিন টেইলর মারটিনেজ, স্থানীয় এসেম্বলিম্যান লুইস সিপুলভেদা, কাউন্সিল মেম্বার এনাবেল পালমা, ব্রঙ্কস সার্ভিস সেন্টারের ডাইরেক্টর কাজরী চৌধর প্রমুখ।


প্যানেল আলোচকবৃন্দ জনসাধারণের নিরাপত্তা, মানবাধিকার সুরক্ষা, মুসলিম কমিউনিটির ক্ষমতায়নসহ ক্রাইম, হেইট ক্রাইম ইত্যাদি বিষয়ে করনীয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। তারা জনসাধারণের নিরাপত্তার বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে মানবাধিকার বিষয় এবং প্রতিবেদন ভিত্তিক ঘটনার আলোকে বক্তব্য রাখেন।


অনুষ্ঠানে প্রশ্নত্তোরপর্বে বিভিন্ন দাবি জানিয়ে পরামর্শমূলক বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আমেরিকান কমিউনিটি কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আইনজীবি মো. এন মজুমদার মাস্টার অব ল, ব্যান্ডস-এর প্রেসিডেন্ট মূলধারার রাজনীতিক আবদুস শহীদ, প্রখ্যাত নারী নেত্রী সাউথ এশিয়ান কমিউনিটি উইমেন লিডার মাজেদা এ উদ্দিন, মামুন’স টিউটরিয়ালের প্রিন্সিপাল মূলধারার ম্যাথ টিচার শেখ আল মামুন, মামুন’স টিউটোরিয়ালের ডাইরেক্টর ডা. নাহিদ খান, বাংলাদেশ আমেরিকান কমিউনিটি কাউন্সিলের সহ সভাপতি সাখাওয়াত আলী, সেক্রেটারী নজরুল হক, কমিউনিটি এক্টিভিস্ট মির্জা মামুন সহ বিভিন্ন কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ।


প্রশ্নত্তোরপর্বে বর্ণবৈষম্য হামলাসহ ছিনতাই, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানান হয়। এসময় ব্রঙ্কসে সাম্প্রতিকালে সংঘটিত হেইট ক্রাইম ভিকটিমদের ওপর বীভৎস হামলার বিবরণসহ তাদের বর্তমান করুণ অবস্থার কথাও তুলে ধরেন কেউ কেউ। এ ধরণের সেমিনার কমিউনিটির অনেক কল্যাণে আসবে বলে মন্তব্য করে আয়োজক কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান হয়।
জনসচেনতামূলক বিশেষ এ সংলাপ অনুষ্ঠানে অতিসম্প্রতি কুইন্সের ওজনপার্কে আল ফোরকান জামে মসজিদের ইমাম আলাউদ্দীন আকুঞ্জি এবং একই মসজিদের মুসল্লি তারা মিয়া হত্যাকান্ডের বিষয়টিও বার বার ওঠে আসে।


অনুষ্ঠানে কমিউনিটির নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাবাজার জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিন, বাংলাবাজার জামে মসজিদের খতীব মাওলানা আবুল কাশেম ইয়াহইয়া, সিংগেরকাচ আলীয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আ ক ম আবদুন নূর, বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কসের সাবেক সভাপতি মো: শামীম মিয়া, সভাপতি সাহেদ আহমসদ, সহ সভাপতি তৌকিকুর রহমান ফারুক ও সাধারণ সম্পাদক সেবুল খান মাহবুব, ব্রঙ্কস বাংলাদেশ এসোসিয়েশনের সভাপতি এ ইসলাম মামুন, জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল বাছির খান, বাংলাদেশী আমেরিকান উইম্যান এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট রেক্সোনা মজুমদার, নবীগঞ্জ থানা কল্যাণ সোসাইটি ইউএসএ’র সভাপতি আলহাজ্ব কেরামত আলী, কমিউনিটি একটিভিস্ট নুর উদ্দিন, মোশাহেদ চৌধুরী, হেইট ক্রাইম ভিকটিম মজিবুর রহমান প্রমুখ। সেমিনারে মূলধারাসহ বিভিন্ন কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।


সেমিনারে সাউথ এশিয়ান ফান্ড ফর এডুকেশন, স্কলারশীপ অ্যান্ড ট্রেনিং নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেমিনারে আসা লোকদের অনুবাদ সহায়তা দেন বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড সিইও মাজেদা এ উদ্দিন।


বিশেষ এ আলোচনায় সাম্প্রতিক সময়ে ব্রঙ্কসে বাংলাদেশীদের ওপর আলোচিত বেশ ক’টি হামলার বিবরণ তুলে ধরে কমিউনিটির পক্ষ থেকে এ ঘটনাগুলোকে হেইট ক্রাইম বলে দাবি করা হয়। এসব ঘটনায় ব্রঙ্কসে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলেও সেমিনারে অভিহিত করা হয়।


মুসলিম কমিউনিটিকে বিশেষ এ সংলাপে আইনজীবি মো. এন মজুমদার সাম্প্রতিক সময়ে ব্রঙ্কসে বাংলাদেশীদের ওপর আলোচিত বেশ ক’টি হামলার বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি এসব ঘটনায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ভ’মিকারও তীব্র সমালোচনা করেন।ে হইট ক্রাইমের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি জানান, ব্রঙ্কসে গত ৫ আগস্ট শুক্রবার রাত প্রায় দশটায় ব্রঙ্কসের ওয়েস্টচেস্টার স্কয়ার সাবওয়ের অদূরে গিøব এভিনিউ এবং ওভারিং স্ট্রিটের কর্ণারে মোঃ আলী সাবরি হায়দার (৪০) নামে একজন বাংলাদেশী সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন। আলী হায়দার কে সন্ত্রাসীরা এলোপাতারি কিল ঘুষি মেরে মারাত্মক জখম করে পালিয়ে যায়।

গত ২০ জুন সোমবার রাত প্রায় দশটায় ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার স্টারলিং বাংলাবাজার এভিনিউর স্টারলিং ফার্মেসীর সামনে বø্যাক কার চালক সোহেল চৌধুরী (৪০) কে দু’জন কৃষ্ণাঙ্গ যুবক এলোপাতারি কিল ঘুষি মেরে মারাত্মক জখম করে তার আইফোনটি নিয়ে দ্রæত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গত ১৬ জুন বৃহস্পতিবার রাত প্রায় সাড়ে দশটায় ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার ম্যাগ্রো এভিনিউর মসজিদে তারাবীর নামাজে যাওয়ার সময় অপর বাংলাদেশি আতিক আশরাফকে দুই কৃষ্ণাঙ্গ যুবক একই কায়দায় হামলা চালিয়ে মারাত্মক জখম করে। গত ২৩ এপ্রিল হামলার শিকার হন মো. সাইফুর রহমান।

এরপর বাংলাদেশী কমিউনিটি অব নর্থ ব্রঙ্কসের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম খান ব্রঙ্কসে মারকাত্মভাবে প্রহৃত হন। গত ৬ ফেব্রæয়ারী ক্যাব চালক মো. আতাউর রহমান এবং জানুয়ারীতে ব্রঙ্কসে পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত মুয়াজ্জিন মজিবুর রহমান আক্রান্ত হন। এ ঘটনাগুলোকে হেইট ক্রাইম হিসেবে দাবি করে এসব বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান তিনি।


সেমিনারে পুলিশের পক্ষ থেকে জানান হয়, নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ব্রঙ্কসে ক্রাইম রেইট অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ টহল ব্যবস্থা বাড়িয়েছে। কোন ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানাতে পরামর্শ দিয়ে বলা হয়, যে কোন হামলাকারী, সন্ত্রাসী গ্রেফতারে পুলিশ তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। পুলিশ অবশ্য এসময় হেইট ক্রাইমের সংজ্ঞাও দেন।


পুলিশ জানায়, ক্রাইম রিপোর্টের প্রেক্ষিতে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিশেষ পুলিশি টহলসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে থাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্রঙ্কসে বাংলাদেশী অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় অপরাধজনিত নানা ঘটনা ঘটলেও অনেকেই পুলিশকে জানাতে ভয় পায়। ব্রঙ্কসের বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই সন্ত্রাসী হামলা, ছিনতাই, অপরাধজনিত কার্যকলাপ ঘটলেও অনেক ভিকটিমই পুলিশকে অবহিত করে না। সেজন্য পুলিশ ডিপার্টমেন্টকে সংশ্লিষ্ট এলাকায় যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হিমশিম খেতে হয়। নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ৪৩ পুলিশ প্রিসেনক্টের কমান্ডিং অফিসার ফাস্টো বি পিসারডো এলাকায় যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট সকলের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন।


সেমিনারে মেয়র অফিসের কমিউনিটি এ্যাফিয়ার্স ইউনিটের সিনিয়ার এডভাইজার ড. সারা সাইয়েদ কমিউনিটির জননিরাপত্তা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বিশেষ করে মুসলিম কমিউনিটির ক্ষমতায়ন ও হেইট ক্রাইম রোধকল্পে মেয়র অফিসের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সকল সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করা হয়।

এসএ