পাকিস্তানের একটি স্কুলে তালেবান হামলায় ১৪১ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় আজ বুধবার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক শুরু হয়েছে। শোকে কাতর নিহত কোমলমতি শিশুদের বাবা-মা ও স্বজনেরা। তাদের সঙ্গে শোক ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন পাকিস্তানসহ সারা বিশ্বের সর্বস্তরের মানুষ। সবাই দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে নিহতদের স্মরণ করছেন।

এদিকে বর্বরোচিত এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ। তারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একাট্টা হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় পেশোয়ারের ওয়ারসাক রোডে সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি স্কুলে গতকাল মঙ্গলবার ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছে তালেবান। এতে ১৩২ জন স্কুলশিশু ও নয়জন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে ১২৫ জন। পাকিস্তানে এ যাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা এটি।

পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানান, হামলাকারী মোট ছয় জন ছিল। নিরাপত্তা বাহিনীর পোশাক পরে অতর্কিতে স্কুলে হামলা চালায় তারা। নিহত ১৪১ জনের অধিকাংশই মারা যায় আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণে। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত হয় ছয় হামলাকারীর সবাই। এরপর শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান ঘটে।

তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। সংগঠনটির মুখপাত্র মোহাম্মদ খোরাসানি বলেন, ‘উত্তর ওয়াজিরিস্তান ও খাইবার এলাকায় সেনাবাহিনীর অভিযান “জারব-ই-আজাব”-এ তালেবানদের হত্যা ও তাদের পরিবারকে হয়রানি করার জবাবে এই হামলা। আমাদের স্বজন হারানোর বেদনা তারাও (সেনারা) বুঝতে পারবে।’

তালেবানের বর্বর এই হামলার ঘটনায় সারাবিশ্বে নিন্দার ঝড় উঠেছে। পাকিস্তান সরকার ও সামরিক বাহিনী তালেবানদের নির্মূলের পুনঃঅঙ্গীকার করেছে।

এ ঘটনাকে ‘জাতীয় ট্র্যাজেডি’ আখ্যায়িত করে দেশব্যাপী তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। তিনি বলেন, ‘এরা আমার সন্তান। এটা আমার ক্ষতি। এটা জাতির ক্ষতি।’ পরে প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় একটি বৈঠক করেন।

শোক জানিয়েছে এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মালালা ইউসুফজাই। নারী শিক্ষা নিয়ে কাজ করায় পাকিস্তানি এই কিশোরী নিজেও তালেবানের গুলিতে আহত হয়েছিলেন। পেশোয়ারের স্কুল শিশুদের এই হত্যার ঘটনায় ‘হৃদয় ভেঙ্গে গেছে’ বলে জানিয়েছে মালালা।

নিরাপরাধ শিশুদের এই হত্যাকাণ্ডকে ‘কাপুরুষোচিত’ বলেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন।

একই ধরনের মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেন, ‘চরম দুঃখজনক এই সময়ে সব ধরণের সহায়তার জন্য ভারত প্রস্তুত বলে পাকিস্তানকে জানানো হয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা হামলার ঘটনাকে ‘বর্বরোচিত’ উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তানের পাশে থাকারও ঘোষণা দিয়েছেন।

ইউরোপের নেতৃবৃন্দও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবোট পাকিস্তানের প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন।

সেনাবাহিনী বলেছে, হামলার সময় স্কুলে ৫০০ শিক্ষার্থী ছিল। অভিযানে অধিকাংশকেই বের করে আনা সম্ভব হয়। তবে আহত হয় ১২৫ জন। তাদের নিকটবর্তী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকেরা জানান, আহতদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অধিকাংশেরই মাথা ও পেটে গুলি লেগেছে। রক্তের ঘাটতি দেখা দেয়ায় স্বেচ্ছা রক্তদানের আহ্বান জানানো হয়েছে।

পেশোয়ারের হাসপাতালে হাসপাতালে আহত সন্তানের জন্য অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন প্রহর কাটছে। ফুলে ছাওয়া কফিন কাঁধে রাজপথে ছুটছে লাশের মিছিল। পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে রাতে মোম জ্বালিয়ে শোক প্রকাশ করেন সাধারণ মানুষ। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।

মঙ্গলবারের এই হামলায় ১৫ বছর বয়সী ছেলে হারানো এক বাবা বলেন, ‘যখন খবর পেলাম, আমি তখন আদালতে। খবর পেয়েই হাসপাতালে ছুটে গেছি। আমার মানিকের বুকের ডান দিকে আর হাতে গুলি লেগেছিল।’ তিনি কান্নায় ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলেন না। ১০ বছর বয়সী গুল শেরের চাচা সাজিদ খান জানান, তার ভাইপোর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল।

চোখ মুছতে মুছতেই তিনি বললেন, ‘আমরা এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে পারব না। আমরা মহান আল্লাহর কাছে এর বিচার চাই।’

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, নিহতদের অনেকের দাফন মঙ্গলবারেই শেষ হয়েছে। বাকিদের দাফন আজ করা হচ্ছে। দাফনের সময় সৃষ্টি হচ্ছে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের। আদরের সোনামণিকে কবরে রাখতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন স্বজনরা। ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ।

পাকিস্তানে জাতীয় পর্যায়ে শোক পালনের কর্মসূচি চলছে। বিদেশে পাকিস্তানি দূতাবাসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। খোলা হয়েছে শোকবই।

এমএ