২০১১ সাল। প্রায় দুই দশক পর তিউনিশিয়ার বদ্ধ রাজনৈতিক দুয়ার খুলে দেয়া হলো। মনে হলো, দেশটি স্বাধীন হলো।

এখন কোনো আতঙ্ক ছাড়াই মনের বিশ্বাস আর কথাটি বলা যায়। ফিরে এলেন সাইয়েদা ওনিসি। তবে তখন তিনি ভাবেননি স্থায়ী হবেন।

ভাবখানা, একটু দেখি না। তারপর দেখা যাবে। বড় কোনো রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাও তার মধ্যে তখন ছিল না।

তবে ২৯ বছরের এ তরুণী কিন্তু নজর এড়িয়ে থাকতে পারেননি। এক দিকে প্রতিভা, অন্য দিকে সময়। দু’টিই তাকে আন নাহদা পার্টির নেতৃত্বে নিয়ে আসে। আর চলতি বছরের আগস্টে তিনি হয়ে যান দলটির কারিগরি প্রশিক্ষণ ও উদ্ক্তাবিষয়ক উপমন্ত্রী। এর মাধ্যমে তিনি হলেন তিউনিশিয়া সরকারের সবচেয়ে কনিষ্ঠ মন্ত্রী।

সাইয়েদার মা-বাবা ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইন আল-আবেদিন বেন আলীর রাজনৈতিক বিরোধী। আন নাহদার সাথে তার সম্পৃক্ততা ছিল। এর জের ধরে ১৯৯১ সালের একটি মিথ্যা অভ্যুত্থান মামলা হয় তাদের বিরুদ্ধে। এ কারণে ১৯৯২ সালে তাদের দেশত্যাগ করতে হয়। তখন সাইয়েদার বয়স ছিল পাঁচ বছর।

সাইয়েদা বড় হন প্যারিসে। তিউনিশিয়ার রাজনৈতিক উদ্বাস্তুদের একটি সক্রিয় সম্প্রদায় ছিল ফ্রান্সে। ফলে রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনা তার মনে দানা বাঁধতে থাকে তখন থেকেই। প্রবাস জীবনের অনেক সুফলও আছে।

একটি হলো ভয় দূর হয়ে যাওয়া। অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস তখন অনেক বেড়ে যায়। ওই সময়টাতে আন নাহদার অনেক নেতাই পশ্চিম ইউরোপ সফর করতেন। তাদের কাছে বেন আলী সরকারের নানা অপকর্মের কথা তারা শুনতেন।

এই করতে করতেই তিনি কখন যে আন নাহদার সদস্য হয়ে গেছেন, টের পাননি। তারপর সময়ের পরিক্রমায় তিনি এখন আন নাহদার নেত্রী।

২০১৪ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিউনিসিয়ান পার্লামেন্টে সদস্য হন। তার কাছে নতুন জগৎ খুলে গেল। তিনি দেশ গড়ার নতুন স্বপ্ন দেখতে থাকেন। তার কাছে মনে হলো, তিউনিশিয়া এখন ভবিষ্যতের সন্ধিক্ষণে আছে। রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যে সম্পর্ক নতুন করে গড়ার কাজটি তাকে করতে হবে।

তিনি তার মন্ত্রিত্বকে এ কাজেই ব্যবহার করার উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি মনে করেন, তিনি যদি জাতীয় কর্ম কৌশল যথাযথভাবে তৈরি করতে পারেন, তবে তা তার দেশকে অনেক এগিয়ে দেবে।

তিউনিসিয়া এখন নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে। নানা বৈষম্য, অপশাসন দূর করার কর্মসূচি গ্রহণ করছে। এ প্রসঙ্গে তিনি জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা অবসানে সম্প্রতি আনা একটি বিলের কথা উল্লেখ করেন। আন নাহদার প্রবল সমর্থন পেয়েছে বিলটি। আশা করা হচ্ছে চলতি বছরই বিলটি পার্লামেন্টে পাস হয়ে যাবে।

সাইয়েদা বলেন, রাষ্ট্রর পরিসীমা নতুন করে নির্ধারণ এবং রাষ্ট্র কিভাবে নারীদের রক্ষা করতে পারে, তা চিহ্নিত করার এটা একটি সুযোগ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখন রাষ্ট্র স্বীকার করে নিচ্ছে, আপনি ঘরের ভেতরেও যদি নারীদের ওপর সহিংসতা প্রয়োগ করেন,

তবুও আপনাকে দায়ী করা হবে। কারণ আপনি যে অপরাধটা করেছেন, তার মূল্য পুরো সমাজকে দিতে হবে। ওই সহিংসতার কারণে নিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্য ইত্যাদির আলোকে সমাজের ক্ষতি করছেন আপনি।

অর্থনৈতিক কার্যক্রমে রাষ্ট্রের ভূমিকাও নতুন করে নির্ধারণের জন্য কাজ করছেন সাইয়েদা। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শ্রম ও ট্রেড ইউনিয়নের সাথে আলোচনা শুরু করেছেন।

শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি শ্রমিকদের রক্ষার জন্যও তিনি কাজ করছেন।ইউনিয়নগুলোকে সে দিকে কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছেন।

সাইয়েদা আরেকটি কাজের সাথে যুক্ত। ২০১৬ সালে আন নাহদা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন, তারা রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা করছে। দলটি আরেকটি নতুন পরিভাষা গ্রহণ করে। এটি হলো ‘মুসলিম ডেমোক্র্যাটস’। এর মাধ্যমে তারা অন্যান্য ইসলামি দল থেকে নিজেদের প্রতীকীভাবে আলাদা করে নেয়।

এ ব্যাপারে অবশ্য মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।সাইয়েদার মতে, এমন অবস্থান গ্রহণ করা খুবই দরকারি হয়ে পড়েছিল। কারণ অনেকেই অভিযোগ করছিল, আন নাহদা বাইরের উপাদান তিউনিসিয়ায় চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে।

বিশেষ করে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে তার সম্পর্ক থাকার কথা প্রচার করে দলটিতে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালানোর একটি প্রয়াস দেখা যায়। নতুন পরিভাষাটির মাধ্যমে আন নাহদা পুরোপুরি তিউনিসিয়ার

দল হিসেবে নিজেদের পরিচিত করবে।সাইয়েদা মনে করেন, আন নাহদা এখন প্রমাণ করছে, আধুনিক একটি ইসলামি দলের সাথে গণতান্ত্রিকব্যবস্থার কোনো সঙ্ঘাত নেই। দুটি বৈশিষ্ট্য একইসাথে চলতে পারে।

সাইয়েদার সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তিনি সবই দারুণভাবে সামাল দিচ্ছেন। আর এটাই তাকে নতুন পরিচিতি এনে দিয়েছে। তার ভিশন, তার মিশন তাকে নেতৃত্ব দিতে তৈরি করেছে, তিনিও তৈরি হচ্ছেন।

মাহমুদ