ভারতের বিজেপি সরকারের গো-মাংস রাজনীতির তীব্র ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে প্রতিবেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর।

সৌদি আরবের শীর্ষ মিডিয়া আরব নিউজ এধরনের একটি প্রতিবেদনে বলেছে, দেশটি থেকে গরু আমদানি ৭০ শতাংশ কমে যাওয়ায় ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে গো-মাংস সংশ্লিষ্ট সবশিল্প। আর হু হু করে বাড়ছে মাংসের দাম। আর এতে বেজায় খুশি প্রকাশ করেছে বিজেপি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের স্বারষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ তার সংসদীয় আসন লক্ষৌর এক জনসমাবেশে বলেন, ‘বাংলাদেশের হাই কমিশনার মুয়াজ্জেম আলী তাকে বলেছেন, তার দেশে গরুর মাংসের দাম আকাশ ছুঁয়েছে।’ রাজনাথ একথা বলার সময় গর্বে ফেঁটে পড়েন। তার মেজাজ অত্যধিক আনন্দে পরিপূর্ণ ছিল।

গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম বৃদ্ধি নিয়ে মুয়াজ্জেম আলী উদ্বেগ প্রকাশ করার পর রাজনাথ বাংলাদেশে ভারতের গবাদি পশু রফতানি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কারণে বিএসএফের প্রশংসা করেন। উল্লেখ্য, বিএসএফ সরাসরি ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে।

তিনি তথ্য প্রকাশ করে জানান, বিগত বছরে যেখানে বাৎসরিক ২০ থেকে ২২ লাখ গরু বাংলাদেশে প্রবেশ করতো এবছর সেখানে মাত্র ২ লাখ থেকে আড়াই লাখ গরু প্রবেশ করেছে। ফলে সীমানা জুড়ে গরুর মাংসের দাম তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

রাজনাথ স্পষ্টতই ভারতীয় জনতা পার্টির বিতর্কিত গরুর মাংস নিষিদ্ধের রাজনীতি বাংলাদেশে প্রসারিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কিন্তু হিন্দুত্ববাদি এমন প্রচারণা বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশির মাঝে ভারত বিরোধী অনুভূতি ছড়িয়ে দিচ্ছে।

বিজেপির এক সাবেক সভাপতি বাংলাদেশে অদুগ্ধজাত উদ্বৃত্ত পশু রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন। যার ফলে দেশটির অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য ১ বিলিয়নে দাঁড়ায়।

সাম্প্রতিক রাজিব মেহরিসি ও মোজাম্মেল হক খানের মধ্যে দু’দিনব্যাপী বৈঠকে বিজেপির গরু রাজনীতির ঘোর ছায়া বিস্তার করে। গত মাসে ঢাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে জঙ্গিদের সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও জাল নোটের অন্ত:প্রবাহ ইস্যুর ওপর বেশি গুরুত্ব দেয় ভারত। তবে বিএসএফের গবাদি পশু বাণিজ্য দমন অভিযান বন্ধের বিষয়ে অধিক সময় ও শক্তি ব্যয় করেও কোন আলোচনা হয়নি।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক সংবাদে স্বরাষ্ট্র সচিবদের বৈঠকের উদ্বৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘একজন ভারতীয় কর্মকর্তা বৈঠক সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশ বিএসএফের গবাদি পশু সরবরাহ দমন অভিযানকে প্রধান ইস্যু হিসেবে উত্থাপন করে।

কারণ ভারত থেকে গবাদি পশু সরবরাহ ৭০শতাংশ কমে গেছে। পাশাপাশি গরুর মাংসের দাম ঊর্ধ্বমুখি। যা গরুর মাংস শিল্পের ওপর বিরুপ প্রভাব ফেলছে।

রাজনাথের হিন্দুত্ববাদি-ইন্ধনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশে জবাইকৃত প্রতি চারটি গরুর তিনটিই ভারত থেকে আসতো।

কারণ তখন ভারতের অতিরিক্ত গবাদি পশু সরবরাহে নিধেধাজ্ঞা ছিল না। দুই দেশের ৪ হাজার কি.মি. সীমান্ত জুড়ে অদুদ্ধজাত গবাদি পশু সরবরাহ করা হতো।

বিজেপি সরকার গরু রক্ষার পক্ষে। ২০১২ সালের ৯ আগস্টে নরেন্দ্র মোদি তার ওয়েবসাইটে গো-মাংস বিরোধী এজেন্ডাকে অন্তর্ভূক্ত করেন।

পরবর্তীকালে ২০১৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আরএসএস প্রধান মহন ভগবত গরুর সুরক্ষা করেন। পরে বিজেপি ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা দেয়, তারা সরকার নির্বাচিত হলে গরুর সুরক্ষা করবে।

কিন্তু গবাদি পশুর অবরোধে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি বাংলাদেশে গরুর সঙ্কট নিয়ে বাংলাদেশের শীর্ষ ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে তিন পর্বের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা এইচটি ইমাম বলেন, প্রাপ্ত তথ্যে এতে কোন সন্দেহ নাই যে, ভারতের কঠোরতার কারণে গো-মাংস ব্যবসা ও চামড়া শিল্প ঘুরপাক খাচ্ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের গরুর মাংস প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট, কসাইখানা, ট্যানারি এবং হাড় নিষ্পেষণকারী কারখানা ঐতিহ্যগতভাবেই ভারতীয় গরুর ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের শীর্ষ গো-মাংস রফতানিকারক সৈয়দ হাসান হাবিব বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, তাকে আন্তর্জাতিক অর্ডারের ৭৫ শতাংশ বাতিল করতে হয়েছে। তিনি গাল্ফ রাষ্ট্রগুলোতে বছরে ১২৫ টন গো-মাংস রফতানি করেন।

হাবিবের মতোই বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ এ সংবাদ সংস্থাকে বলেন, ১৯০টি ট্যানারির ৩০টি চামড়ার অভাবে কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে। যার ফলে চার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত পরিসংখ্যান মতে, যদি বিএসএফ বাংলাদেশে সব গবাদি পশু সরবরাহ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পারে তাহলে মোদি-রাজনাথ সরকার ভারতের উদ্বৃত্ত্ব অদুগ্ধজাত গবাদি পশুর আশ্রয় ও খাওয়া বাবদ ৩১ হাজার কোটি রুপির ওপর ব্যয় করবে।

তবে একথাও ঠিক যে, ভারতে নতুন গরুনীতির বোঝা সাধারণ করদাতাদের বহন করতে হবে। অতএব সাধারণ মানুষের জন্য কী ভাল তা বোঝার জন্য একটি প্রকাশ্য বিতর্ক প্রয়োজন। অবশ্যই এটা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এটা শুধু অর্থনৈতিক কারণে নয়, ভারতের প্রভাবিত এলাকায় তার প্রাধান্যতা নিশ্চিত এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই এটা প্রয়োজন।আস

এসএইচ