সাগরে ভাসমান অসহায় রোহিঙ্গা মুসলমান ও বাংলাদেশীদের প্রতি যথাযথ মানবিক সম্মান প্রদান ও তাদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে থাই সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে জাতিসংঘ।

রোববার জাতিসংঘ মহাসচিব বান কী মুন থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী প্রাউত চান ওচা-র প্রতি এই আহবান জানান।

একইসাথে এই সংকট সমাধানে চলতি মাসের শেষের দিকে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের যে আহবান করেছে থাই সরকার তার প্রতিও সমর্থন জানান বান কী মুন।

তিনি বলেন, অনেক দিন ধরে সাগরে ভেসে থাকা মানবেতর জীবন-যাপনকারী এসব মানুষের মানবিক মর্যাদা এবং একই সাথে মৌলিক প্রয়োজন পূরণের অধিকার রয়েছে যা কোনভাবেই ক্ষুণ্ন হতে দেয়া যায় না।    

রোববার সকালে থাই প্রধানমন্ত্রীকে টেলিফোন করে বান কী মুন সাগরে ভাসমান মিয়ানমারের রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশের শ্রমিকদের দুর্ভোগ নিয়ে তার এই উদ্বেগের কথা জানান বলে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন থাইল্যান্ড সেনাবাহিনীর ডেপুটি মুখপাত্র উইরাচান সুকনথাপ আতিপাক।  

জাতিসংঘের তথ্যমতে অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ নৌকা যোগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে উন্নত জীবন ও কাজের সন্ধানে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়েছেন।

এদের মধ্যে অবশ্য কেউ কেউ তাদের গন্তব্যে পৌঁছতে সক্ষম হলেও হাজার হাজার মানুষ এখনও পর্যন্ত সাগরে ভেসে বেড়াচ্ছেন। কারণ নৌকাযোগে অবৈধপথে আসা শ্রমিকদের মোটেই আশ্রয় দিচ্ছে না ওইসব দেশ।

এ পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার জাতিসংঘের মহাসচিব বান কী মুন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সরকারকে তাদের সীমান্ত ও বন্দর খোলা রাখার আহবান জানান যাতে বিপর্যন্ত মানুষগুলো সাময়িক আশ্রয় পান এবং সময় সুযোগ মতো তাদেরকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যায়।

এদিকে, সাগরে ভাসমানদের সংকট গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ এবং তাদেরকে প্রয়োজনীয় মানবিক সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে বলে রোববারের টেলিফোন আলাপকালে জাতিসংঘ মহাসচিবকে আশ্বস্ত করেছেন থাই প্রধানমন্ত্রী।

থাই সেনা মুখপাত্র আরও বলেন, তার দেশের সরকার গত সপ্তাহে ভাসমান মানুষদের যে দলগুলোকে পেয়েছে তাদের নৌকা মেরামত, জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্য, পানি ও ওষুধ প্রদানসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করেছে যাতে তারা অন্যত্র স্থানান্তর হতে পারেন।

অবশ্য থাই কর্তৃপক্ষ এই উদ্বাস্তুদের তাদের মাটিতে অবস্থান করতে দেয়নি জানিয়ে ওই মুখপাত্র বলেন তারা অন্য দেশে চলে যেতে চেয়েছিলেন।

আগামী ২৯ মে থাই সরকার ব্যাংককে একটি বিশেষ সম্মেলন করতে যাচ্ছে তার দেশে অবস্থানকারী অনিয়মিত অভিবাসীদের ব্যাপারে, যেখানে সংশ্লিষ্ট ১৫ দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। এর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম এবং বাংলাদেশ।  

টেলিফোন আলাপকালে বান কী মুনকে থাই প্রধানমন্ত্রী প্রাউত বলেন, সম্মেলনে অংশ নেয়া ১৫ দেশ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা এই সমস্যার গঠণমূলক সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে মতবিনিময় করবেন।

প্রাউত আরও বলেন, এসব মানুষের ভাগ্য নির্ধারণে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট-আসিয়ানকে (এসোসিয়েশন অব সাউথ-ইষ্ট এশিয়ান ন্যাশনস) সম্মেলনের পক্ষ থেকে দায়িত্ব দেয়া হতে পারে।

তবে, এরই মধ্যে গত শুক্রবার আসিয়ানের অন্যতম সদস্য মিয়ানমার ব্যাংককের ওই সম্মেলনে যোগ দিতে তার অপারগতার কথা জানিয়ে দিয়েছে।

এদিকে, থাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ডেপুটি মুখপাত্র মেজর জেনারেল সানসারন কেওয়াকামনারড বলেছেন, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের মধ্য থেকে আসা অনিয়মিত অভিবাসীদের নিয়ে সৃষ্ট সংকট মোকবেলায় থাইল্যান্ড সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে সহযোগিতা করতে চায়।   

অবশ্য থাই সরকারের উচিত উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেয়া এবং তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা-এমন দাবিকে নাকোচ করে দিয়ে এই মুখপাত্র বলেন এতে দেশটির নিজস্ব আইনের লঙ্ঘন হবে এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

মুখপাত্র সানসারন আরও বলেন, এ সমস্যার সমাধানে সবচেয়ে যথোপযুক্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ হলো এসব অভিবাসীদের তাদের মূল দেশে ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্যোগ গ্রহণ।  

থাই সেনা প্রধান জেনারেল উদোমদেজ সিটাবারত রোববার বলেন, আমেরিকার দেয়া প্রস্তাব অনুযায়ী উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দিতে থাই সরকারের কোন আশ্রয়কেন্দ্র বা রিফিউজি ক্যাম্প নির্মান করা ঠিক হবে না। অবশ্য এদেরকে স্ব স্ব দেশে ফেরত নিতে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রস্তুতির জন্য এদেরকে সাময়িকভাবে থাইল্যান্ডে অবস্থান করতে দেয়া যেতে পারে।  

থাই সেনা প্রধান বলেন, এ ধরনের অস্থায়ী আশ্রয়ের  জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজছে তার সরকার। যারা অবৈধভাবে থাইল্যান্ডে ঢুকে পড়েছেন তাদের ব্যাপারে দেশের মানুষকে জানাতে চায় না থাই সরকার, যাতে কোন ঝামেলা ছাড়াই এসব মানুষকে যথাযথ মানবিক সহায়তা দিয়ে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যায়।  

তিনি বলেন, আমাদের দেশ ট্রানজিট পয়েন্টে অবস্থান করায় আমরা এই সমস্যার সমাধানে কতটা আন্তরিক ও সদিচ্ছা নিয়ে কাজ করছি তা অন্যান্য দেশ দেখতেই পাচ্ছে।

রোহিঙ্গাসহ উদ্বাস্তুদের পাচারের জন্য যেসব গোষ্ঠী বা অপরাধী চক্র চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও থাই সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান দেশটির সেনা প্রধান।

কেবি