যুদ্ধ বিধস্ত ইয়েমেনে খালেদ বাহা’র ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নিয়োগ পাওয়াকে  দেশটিতে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইয়েমেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদ বাহাকে গত রোববার (১২ এপ্রিল ২০১৫) ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের উপলব্ধিতে যেই বিষয়টি আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে তা হলো- ইয়েমেনের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বু মানসুর হাদিই দেশটিতে বিদ্যমান সমস্যার অন্যতম কারণ। তাই তাকে দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

এদিকে, সামরিক অভিযানের পর প্রেসিডেন্ট হাদিকে দিয়ে ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে একজনের নাম প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে ইয়েমেনে সৌদি আরব নিজের রাজনৈতিক পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছে কীনা সেই প্রশ্নও উঠে আসছে।   

পাশাপাশি বাহাই ইয়েমেনের কার্যকর প্রেসিডেন্ট হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন, কারণ দেশটির বৃহত জনগোষ্ঠীর কাছে হাদীর চেয়ে বাহার জনপ্রিয়তা বেশি।  

বাহা একমাত্র রাজনীতিবিদ যিনি এর আগেই ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ’র দল এবং বিদ্রোহী হুথি -উভয়ের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছিলেন।

চলতি (২০১৫) বছরের জানুয়ারি মাসে হাদি, হুথি  এবং ইয়েমেনের অন্যান্য রাজনৈতিক নিয়ামক শিক্তগুলোর মধ্যে শান্তি ও সমঝোতার ‘বিতর্কিত’ চুক্তির মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন বাহা।

এদিকে, ইয়েমেনের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে গত তিন বছর হাদি দেশ শাসন করেছেন কোন ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছাড়াই। কয়েকজন দুর্বল পরামর্শকের ওপর ভর করে কোন সুস্পষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা ছাড়াই এভাবে দেশ শাসন করেছেন হাদি।

সম্প্রতি হুথি বিদ্রোহীদের দ্বারা গৃহবন্দী হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট হাদির অস্থায়ী পদত্যাগের পর দেশটিতে যে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয় ভাইস প্রেসিডেন্ট না থাকায় তা আরও জটিলতরো হয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে হাদির ইয়েদেনে পালিয়ে যাওয়া এবং সেখান থেকে সৌদি আরবে আশ্রয় নেয়ার পর পরিস্থিতি আরও সংঘাতময় হয়ে উঠে এবং ভাইস-প্রেসিডেন্টের তীব্র প্রয়োজনীয় দেখা দেয়। আর এমনই পরিস্থিতিতে বাহাকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে হাদির নিয়োগকে স্বাভাবিকভাবেই দেখছেন দেশটির বাসিন্দারা।  

মনে করা হচ্ছে ইয়েমেন পরিস্থিতি কখনই সিরিয়া, ইরাক বা সোমালিয়ার মতো হবে না। ইয়েমেনের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় ইতোপূর্বে সংগঠিত যেকোন গৃহযুদ্ধ বা সংকটের সময় দেশটি কোন না কোন রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছেছে যা অপরাপর দেশের বেলায় খুব কমই দেখা যায়।

অধিকন্তু বাহাই একমাত্র উচ্চ পর্যায়ের কোন রাজনৈতিক নেতা যাকে হুথি বিদ্রোহীরা মুক্তি দিয়েছিলেন, যা এ কথারই ইঙ্গিত বহন করে যে তাকে হুথিরা নিজেদের জন্য বিপজ্জনক মনে করেননি।  

এর আগে বাহা একসময় সালেহ’র নেতৃত্বাধীন ইয়েমেনের তেলমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে কানাডার রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দক্ষিণের হাদরামাউত প্রদেশ থেকে উঠে আসেন, যিনি এক পর্যায়ে দেশটির উত্তর ও দক্ষিণের রাজনৈতিক ঐক্য সুরক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

বাহা’র  ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগকে এখন সংঘাতময় ইয়েমেনে রাজনৈতিক সমঝোতার পথে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবেই দেখতে চান অনেকে।

এই নিয়োগের ফলে হুথি বিদ্রোহী এবং সালেহ’র অনুগতদের কাছে যেই শক্ত বার্তাটি পৌঁছাবে হা হলো- হুথি-সালেহ যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে একটি নিরাপদ ইয়েমেন গঠনে দেশটির আমজনতার আশা-আকাঙ্খার সাথে সৌদি আরবও অনেকটাই সহমত পোষণ করছে এবং দেশটিতে একটি রাজনৈতিক সমাধানের ব্যাপারে আশাবাদী সৌদি সরকার। 

এখন প্রশ্ন হলো একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা এবং রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইয়েমেন সক্ষম হবে কী না? এর বাস্তবসম্মত ও যুক্তিযুক্ত উত্তর হলো “হ্যা”।  

ইয়েমেন সব সময়ই টিকে থাকার লড়াইয়ে একটি ব্যতিক্রমধর্মী রাজনৈতিক ও সামাজিক দেশ হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। একটি গরীব আরব দেশ হওয়া সত্ত্বেও দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং রাজনৈতিক সমঝোতার ক্ষেত্রে দেশটি উন্নত সংস্কৃতি ও প্রথা লালন করে আসছে। চরম রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর ও সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়ার এটাই ইয়েমেনের প্রথম ঘটনা নয়।

এমনকী সৌদি আরবের নেতৃত্বে চলমান আগ্রাসন ও বিমান হামলার মধ্যেও ইয়েমেনে গণহারে খাবার সংকট বা গণহত্যার ঘটনা ঘটেনি। এমনকী গত বছরের (২০১৪) সেপ্টেম্বরে যখন হুথি বিদ্রোহীরা সানায় প্রবেশ করেন, তখন তারা যুদ্ধ-বিধস্ত বা গৃহযুদ্ধে লিপ্ত অন্যান্য দেশের বিদ্রোহীদের মতো আচরণ করেননি।

তাই ইয়েমেনের বেলায় জোর দিয়েই বলা যায়, দেশটি সিরিয়া, ইরাক বা সোমালিয়ার মতো হবে না। ১৯৬০ সাল থেকে শুরু করে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেশটিতে যতবারই গৃহযুদ্ধ দেখা দিয়েছে, ততবারই কোন না কোন রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌছেছে সংঘাতে লিপ্ত গ্রুপগুলো, অপর কোন দেশের বেলায় যার নজীর খুবই দুস্প্রাপ্য।   

এই বাস্তবতায়, সৌদি আরবকে অবশ্যই এটা বুঝতে হবে যে হুথি ও সালেহ’র প্রতি অনুগতরা ইয়েমেনের রাজনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ইয়েমেনের রাজনীতি থেকে তাদেরকে বাদ দেয়া সম্ভব নয়।

কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, সালেহ, তার সন্তান বা ভাইপো এবং আবদেল মালিক আল হাওদিকে দেশটির ভবিষ্যত রাজনৈতিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভূক্ত করা হবে। তাদের প্রতি দেশটির মানুষের প্রচন্ড ঘৃণা রয়েছে এবং ভবিষ্যত ইয়েমেনের নেতৃত্বে তাদের অনুপস্থিতিই গুরুত্বপূর্ণ।

তবে, সালেহ অনুসারি এবং তার রাজনৈতিক দল জেনারেল পিপল’স কংগ্রেস- জিপিসি’কে অবশ্যই ইয়েমেনের ভবিষ্যত রাজনৈতিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভূক্ত হতে হবে।

সত্যি বলতে, ইয়েমেনের চলমান যুদ্ধ খুব শিগগিরই সমাপ্তির পথে যাচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। সাধারণ মানুষের ধারণার চেয়েও অনেক কম ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে দ্রুত সময়ের ব্যবধানে ইয়েমেনে ফিরে আসবে স্থিতিশীলতা।  (সহায়ক সূত্র: আল জাজিরা)