পশ্চিম এন্টার্কটিকায় জমাট বরফের স্তর দ্রুতগতিতে গলে যাচ্ছে। প্রতি দুই বছরে গলিত এই বরফের পরিমাণ প্রায় হিমালয় পর্বতের সমান। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

ওই গবেষণার বরাত দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রভাবশালী দৈনিক 'দি সিডনি মর্নিং হেরাল্ড' (the Sydney Morning Herald)-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি বছর গড়ে পশ্চিম এন্টার্কটিকা থেকে ৮ হাজার ৩শ কোটি (৮৩ বিলিয়ন) টন গলিত বরফ অ্যামুন্ডসেন সমুদ্রে (Amundsen Sea) গিয়ে পড়ছে। অ্যামুন্ডসেন হচ্ছে পশ্চিম এন্টার্কটিকার একটি সাগর।

বিগত ২১ বছরের গড় থেকেই বরফ গলার এই ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

'ভূ-তত্ত্ব গবষণা পত্র' (Geophysical Research Letters) নামের ওই সাময়িকীর গবেষণা, যা প্রকাশের জন্য অনুমোদিত হয়েছে, তাতে ১৯৯২ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অ্যামুন্ডসেন সমুদ্রে গিয়ে পতিত গলিত বরফের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য চার স্তরের স্যাটেলাইট পরিমাপক ব্যবহার করা হয়।

এই গবেষণার সহ-সম্পাদক এবং আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও নাসার বিজ্ঞানী ইসাবেলা ভেলিকোগনা বলেন, এন্টার্কটিকায় তুষার বা বরফ গলার মাত্রা বিস্ময়করভাবে বেড়ে চলছে।

এই প্রত্যন্ত এবং জনমানবহীন অঞ্চলটিতেই এখন বিজ্ঞানীদের মূল দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে। এক দশকের কিছু আগে যেমনটি হয়েছিল স্পেন ও পর্তুগালসংলগ্ন এন্টার্কটিকা পেনিনসুলাকে (the Antarctic Peninsula) ঘিরে, যেখানে নাটকীয়ভাবে একের পর এক বরফের স্তর ভেঙ্গে পড়ছিল।

এমনকী ২০০২ সালে লারসেন বিস (Larsen B ice) যা অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী শহর ক্যানবেরা থেকেও আকারে বড় ছিল তা এক মাসের মধ্যে ভেঙ্গে পড়েছিল।

এ বছরেই এক বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাতাসে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের কারণেই লারসেন বিস ভেঙ্গে পড়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল।

গবেষণায় বলা হয়, যদিও লারসেন বিস ভেঙ্গে পড়ার ঘটনায় সমুদ্রে পানির উচ্চতায় তেমন কোন প্রভাব পড়েনি এবং এটা ছিল অনেকটা সেরকমই যেমনটি কোন গ্লাসে ভাসমান বরফ টুকরো গললে হয়। কিন্তু অ্যামুন্ডসেন সমুদ্রে যেভাবে গলিত বরফ ঢুকে পড়ছে তাতে অচিরেই সমুদ্রের উচ্চতা যে বাড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এ বছরই আরেক পৃথক গবেষণায় বলা হয়, পশ্চিম এন্টার্কটিকার বরফের স্তর যেন ক্রমেই একটি স্থায়ী প্রত্যাবর্তনের পথে এগুচ্ছে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তুষারবিষয়ক গবেষক এরিক রিগনট বলেছেন, ক্রমাগত বরফ গলার কারণে আগামী দুই শতকে সমুদ্রের উচ্চতা ১.২ মিটার পর্যন্ত বাড়বে। সমুদ্রের এই উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে গোটা বিশ্বব্যাপী এর বিরুপ পরিণতি দেখা যাবে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন অধ্যাপক রিগনট।

এদিকে, পশ্চিম এন্টার্কটিকায় বরফ গলার সবশেষ এই উদ্বেগজনক গবেষণা প্রতিবেদন এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো যখন বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (World Meteorological Organisation) গত সপ্তাহে পেরুতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনায় ২০১৪ সালকে সবচেয়ে গরম সাল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

বিজ্ঞানীদের অভিমত, পশ্চিম এন্টার্কটিকায় বরফ গলার মধ্যে পাইন আইল্যান্ডের (Pine Island) পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। এটা হচ্ছে পশ্চিম এন্টার্কটিকার এমন একটি পয়েন্ট যেখান থেকে সমুদ্রে ক্রমাগত গলিত বরফ ঢুকে পড়ছে।

ন্যাচার ক্লাইমেট চেঞ্জ (Nature Climate Change)-এর প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৪০ বছর ধরে পাইন আইল্যান্ডে বরফের স্তর ক্রমেই পাতলা হয়ে যাচ্ছে। এতে আগামী ২০ বছর নাগাদ সমুদ্রের উচ্চতা ৩.৫ থেকে ১০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

পাইন আইল্যান্ডের পার্শ্ববর্তী থয়েটস গ্লাসিয়ার (Thwaites Glacier) অঞ্চলে ক্রমাগত গরম পানি ঢুকে বরফের স্তর পাতলা করে দিচ্ছে। এ অঞ্চলের বিশাল বরফ স্তরের নিচের দিক থেকে ক্রমেই বরফ গলছে। এর ফলে এই শতকজুড়ে গোটা বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলেও অভিমত বিজ্ঞানীদের।

বিজ্ঞানীরা আরও আশংকা করছেন, যখন পশ্চিম এন্টার্কটিকায় এভাবে দ্রুততার সাথে বরফ গলছে, তখন বৃহত্তর পূর্ব এন্টার্কটিকায়ও ক্রমাগত তুষার গলার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

উল্লেখ্য, পূর্ব এন্টার্কটিকায় পাহাড় ও পাথুরের ওপর বিশাল বিশাল বরফের স্তর রয়েছে যা ক্রমাগত গলে পড়ার আশংকা করছেন বিজ্ঞানীরা।

জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর জাতিসংঘের আন্ত-সরকার প্যানেল (UN's Intergovernmental Panel on Climate Change)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমের গলিত বরফ ক্রমাগত পূর্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

কেবি