মিয়ানমারে এসে পৌঁছেছে গোলযোগপূর্ণ রাখাইন রাজ্যের অসহায় রোহিঙ্গা মুসলিমদের জন্য মালয়েশিয়ার পাঠানো ত্রাণ সামগ্রীবাহী জাহাজ।
বৃহস্পতিবার দেশটির বাণিজ্যিক রাজধানী থিলাওয়া বন্দরের ডকে ভিড়েছে জাহাজটি। এদিকে ‘নটিকেল আলিয়া’ নামের জাহাজটি পৌঁছার পরপর ডক এলাকার বাইরে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছে দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধরা।

আয়োজকরা ত্রাণবাহী জাহাজটির নাম দিয়েছেন ‘ফুড ফ্লোটিলা ফর মিয়ানমার’। জাহাজটি ঘাঁটে ভেড়ার পর মিয়ানমারের একটি প্রতিনিধি দল ত্রাণ মিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এর মধ্যে মিয়ানমারের সমাজ কল্যাণ মন্ত্র্রীও ছিলেন। আল জাজিরার খবরে বলা হয়, জাহাজটি ভেড়ার পর স্বেচ্ছাসেবী ও চিকিৎসা কর্মকর্তাদের ত্রাণ বিতরণের জন্য ডকে সমবেত হতে দেখা গেছে। সেখানে খাবার, ওষুধসহ প্রায় ৫০০ টন ত্রাণ বিতরণের কথা রয়েছে। পাশাপাশি অসুস্থ রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হবে।
অন্যদিকে এসময় ডক এলাকার বাইরে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা রোহিঙ্গা-বিরোধী প্লাকাড ও মিয়ানমারের জাতীয় পতাকা নিয়ে বিক্ষোভ করেছে। প্রতিবাদকারীরা এ ত্রাণকে বেআইনি আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছে।
রোহিঙ্গা মুসলিমদের জন্য পাঠানো বিপুল পরিমাণ ত্রাণবাহী জাহাজটি গত শুক্রবার মালয়েশিয়া ছেড়ে আসে। এতে খাবার, ওষুধ, কম্বল, তাবু, টয়লেট সামগ্রীসহ সর্বমোট মালামাল রয়েছে ২,৩০০ টন। জাহাজটিতে চিকিৎসকসহ ১৯৫ জন স্বেচ্ছাসেবী ও ১৫ জন নাবিক রয়েছেন। এছাড়া দেশটির রাজনৈতিক দলের নেতারাও এ ত্রাণবহরে রয়েছেন।

মিয়ানমারে একদিনের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনার পর জাহাজটি বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছার কথা রয়েছে ত্রাণবহরটির।
কক্সবাজারের টেকনাফের কয়েকটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ বিতরণের জন্য ত্রাণবাহী জাহাজটিকে টেকনাফ বন্দরে প্রবেশের অনুমতি চেয়েছিল মালয়েশিয়া। কিন্তু এটি অনেক বড় হওয়ায় কারিগরি ও নিরাপত্তা জনিত কারণে টেকনাফ বন্দরে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি বাংলাদেশ। ফলে বিকল্প হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরে ভেড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ত্রাণ মিশনটি। ত্রাণবাহী জাহাজের সর্বশেষ তথ্য জাহাজটিতে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হচ্ছে।

ত্রাণ মিশনের প্রধান আবদুল আজিজ রহিম জাহাজ থেকে জানিয়েছেন, মিয়ানমারের নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ ও চিকিৎসা সেবা দেয়ার পর চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেবে জাহাজটি। আশা করা হচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছবে।
এদিকে চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফ প্রায় ২০০ কিলোমিটারের পথ। তাই সেখান থেকে এসে টেকনাফে ত্রাণ বিতরণ সমস্যাজনক ও কষ্টসাধ্য হবে বলে মনে করছেন স্বেচ্ছাসেবীরা।
খবরে জানানো হয়, জাহাজটিতে ৫০ জন মেডিকেল কর্মকর্তা রয়েছেন। এর মধ্যে ২০ জন ডাক্তার ও ২০ জন স্বেচ্ছাসেবী রয়েছেন। ২৫ জনের দুটি দলে বিভক্ত হয়ে তারা হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু শরণার্থীদের চিকিৎসা সেবা দেবেন।
মেডিকেল টিমের প্রধান ডা. আলবি আবদুল রহমান জানিয়েছেন, এই ৫০ জন কর্মকর্তা বিভিন্ন এনজিও ও মেডিকেল কলেজ থেকে ত্রাণ মিশনে যোগ দিয়েছে। মেডিকেল টিম ধারণা করছে শরণার্থীরা অপুষ্টি, বিপাকীয় রোগ এবং মনো-সামাজিক প্রভাবের মতো স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। বিশেষত নারী ও শিশুরা বেশি আক্রান্ত হতে পারে।
রোহিঙ্গা মুসলিমদের জন্য ত্রাণসামগ্রীবাহী জাহাজ পাঠিয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক বলেছেন, রোহিঙ্গাদের দুর্দশাকে মালয়েশিয়া সরকার আমলে নেবে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য কাজেরও ব্যবস্থা করবে।
এদিকে জাহাজটির বিদেশি সমুদ্রসীমায় প্রবেশের অনুমতি পেতে বারবার সমস্যায় পড়তে হয়েছে মালয়েশিয়াকে। আয়োজকেরা রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিতবিতে নেমে ত্রাণ বিতরণ করার অনুমতি চাইলে তাতে সম্মত হয়নি মিয়ানমার। এর পরিবর্তে দেশটি ইয়াঙ্গুনে ত্রাণবাহী জাহাজ প্রবেশ ও বিতরণের অনুমতি দেয়।
প্রসঙ্গত, মিয়ানমারে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়ন নিয়ে প্রকাশ্যেই কড়া সমালোচনা করে এসেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এর ধারাবাহিকতায় এ বিশাল ত্রাণ বহর পাঠালো দেশটি।
গত বছরের ৯ অক্টোবর মিয়ানমারের পুলিশ ফাঁড়িতে হামলায় ৯ পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার পর থেকে রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চরম নিপীড়ন শুরু করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। জাতিসংঘ গত শুক্রবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী শত শত রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে, ধর্ষণ করা হয়েছে বহু নারীকে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক দুটি সংস্থার দুই শীর্ষ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন মিয়ানমারের সর্বশেষ এ দমন-পীড়নে সহস্রাধিক রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে।

দেশটির এ দমন-পীড়ন থেকে জীবন বাঁচাতে প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরগুলোতে আগে থেকেই অবস্থান করছিল ২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর লোমহর্ষক হত্যা, ধর্ষণ ও বাসাবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার বর্ণনা দিয়েছেন।
মাহমুদ





