ঠিক চার বছর আগের কথা। ২০১৩ সালের ১২ই মে। এক আলো ঝলমলে মনোরম বিকেল। লাহোরে নিজ বাসভবনের বেলকোনিতে এসে দাঁড়ালেন নওয়াজ শরীফ। চোখে-মুখে বিজয়ের প্রসন্ন হাসি। হাত নেড়ে লাখো দর্শককে শুভেচ্ছা জানাচ্ছিলেন। অন্তত এইবারে নিশ্চিতভাবে তিনি তার ক্ষমতার মেয়াদটা পূরণ করে নতুন ইতিহাস গড়বেন – এমনই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তার।
পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে এক ঐতিহাসিক জয় লাভের পর এভাবেই জনগণের সামনে হাজির হয়েছিলেন নওয়াজ শরীফ। দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিকভাবে ক্ষমতার পালাবদল হতে যাচ্ছিল।
আর সেই ঐতিহাসিক ঘটনার মূল নায়ক লাখো আবেগদীপ্ত সমর্থকদের উদ্দেশ্যে সেদিন বলেছিলেন, “আমরা আপনাদের কাছে অঙ্গিকার করেছি, আমরা আমাদের সেই অঙ্গিকার পূরণ করবো।” নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর একটু নজর পেতে সেদিন কত শত কান্ডই না ঘটিয়েছিল হাজারো মানুষ! নওয়াজের লাহোর বাসভবনের সামনের বাগানে ছোট ছোট গাছে চড়ে অনেকেই একনজর প্রধানমন্ত্রীকে দেখার জন্য কত কসরতই না দেখিন করেছিলেন!
কিন্তু মাত্র চার বছরের মাথায় সব কিছু অন্যরকম হয়ে গেল। শরীফের কাছে সেদিনের সেই ঘটনা যেন এখন জীবনের আরেক অধ্যায় যা বহু আগেই অতীত হয়ে গেছে।
গত শুক্রবার (৩০ জুলাই ২০১৭) পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট শরীফকে দেশ পরিচালনায় তথা সরকারি দায়িত্ব পালনের অযোগ্য ঘোষণা করে। একইসাথে তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি আদালতে দুর্নীতি মামলা পরিচালনার নির্দেশ দেয়া হয় সর্বোচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে। আর সর্বোচ্চ আদালতের এমন নির্দেশনার পর প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন নওয়াজ শরীফ।
আর এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারো পাকিস্তানের গতানুগতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটলো। তিনি শেষ করতে পারলেন না তার ৫ বছর মেয়াদের শাসনকাল। দেশটির বিগত ৭০ বছরের ইতিহাসে কোন নির্বাচিত সরকারই তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি।
বিগত দিনগুলোতেও কখনো সামরিক অভ্যুত্থান, কখনো ক্ষমতাসীন জোটে ভাঙ্গন, আবার কখনোবা দেশটির আদালতের হস্তক্ষেপে ক্ষমতার মসনদ থেকে ছিটকে পড়েছিলেন বাঘা বাঘা সব রাজনৈতিক নেতা। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর বিগত ৭০ বছরে দেশটি এককভাবে সবচেয়ে বেশি শাসন করেছে সেনাবাহিনী। প্রায় অর্ধেক সময় দেশটি সেনাশাসনের অধীনে ছিল।
নওয়াজ শরীফ এর আগেও আরো দুই বার ক্ষমতা থেকে অপসারিত হয়েছিলেন। প্রথম বার ১৯৯৩ সালে সেই সময়ের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে তাকে সরে যেতে হয়েছিল। আর সেখানেও নেপথ্যের মূল নায়ক ছিল সেনাবাহিনী। দ্বিতীয়বার ১৯৯৯ সালে সেই সময়ের সেনা প্রধান পারভেজ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন শরীফ।
এদিকে, গত শুক্রবার শরীফকে দেশ পরিচালনার অযোগ্য ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্টের দেয়া রায়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ক্যাপিটাল এফজেডই (Capital FZE) কোম্পানিতে তার ভূমিকার প্রসঙ্গটি উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, ওই কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে শরীফ তার ভূমিকার বিষয়টি পরিস্কার করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
আরব আমিরাতের আইন অনুযায়ী, ওই কোম্পানিতে কাজের অনুমোদন ছিল নওয়াজ শরীফের। আর সেক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন নেয়া ছিল তার জন্য বাধ্যতামূলক। হতে পারে সেই বেতন খুবই যৎসামান্য, কিন্তু তাকে সেটা নিতে হবে।
তবে, নওয়াজ শরীফের বক্তব্য হলো- প্রতি মাসে ১০ হাজার আমিরাতি দিরহাম বা প্রায় ২,৭২০ মার্কিন ডলারের যে মাসিক সম্মানি তার জন্য ওই কোম্পানির পক্ষ থেকে বরাদ্দ ছিল তা তিনি কখনোই গ্রহণ করেননি। আর সে কারণেই এটা তিনি কখনো তার সংসদীয় রেকর্ড বা আর্থিক বিবরণীতে উল্লেখ করেননি।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট নওয়াজের এই বক্তব্য মানতে নারাজ। আদালতের যুক্তি হলো – জড়িত কোন প্রতিষ্ঠান থেকে লাভ তোলা হোক বা নাহোক সেটাকে গ্রহণীয় সম্পত্তি হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
আদালতের রায়ে বলা হয়, ২০১৩ সালের সাধারণ নির্বাচনের নমিনেশন পেপারস দাখিলের সময় নওয়াজ তার কেপিটাল এফজেডই, জেবেল আলি, ইউএই (Capital FZE, Jebel Ali, UAE) কোম্পানির অ-উত্তোলনীয় সম্পত্তির বিবরণ জমাদানে ব্যর্থ হয়েছেন। অর্থাৎ তার পবিত্র নির্বাচনী ঘোষণাপত্র ছিল মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাজানো। আর সে কারণেই পাকিস্তানের পবিত্র মজলিশ-ই-শুরার (সংসদ) সদস্য হিসেবে তিনি অযোগ্য।
আদালতের রায়ে পাকিস্তানের সংবিধানের ৬২ ধারার উল্লেখ করে আরো বলা হয়, এই ধারায় সুস্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে যে পাকিস্তানের সংসদ সদস্যদের অবশ্যই “সৎ ও বিশ্বাসযোগ্য (honest and trustworthy)” হতে হবে।
এদিকে, শনিবার দলের এক সভায় দেয়া ভিডিও বার্তায় নওয়াজ শরীফ প্রশ্ন তোলেন, “When I never took a salary, what would I declare?” অর্থাৎ - “যে বেতন আমি কখনোই তুলিনি, সেটার আবার কি ঘোষণা দিব?”
তিনি আরো বলেন, “যখন আপনি কিছু গ্রহণ করবেন, সেখানে সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু আপনি যখন কিছুই গ্রহণ করেননি সেখানে সমস্যা কোথায়।”
পাকিস্তানের নড়বড়ে গণতন্ত্র
তবে, আদালতের এই সিদ্ধান্তকে যারা সমর্থন করেন – বিশেষ করে নওয়াজ শরীফের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্য হলো, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীনদেরও যে জবাবদিহি করতে হবে তার সেই সংস্কৃতির যাত্রা শুরু।
তবে, সমালোচকরা মনে করেন, শুধুমাত্র রাজনীতিবিদরাই নয়, যখন থেকে সেনা কর্মকর্তা ও আমলাদেরও এমন জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হবে তখনই কেবল সত্যিকার অর্থে এর সুফল পাওয়া যাবে।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, সংবিধানের ৬২ ধারার এমন ব্যবহার করে আদালত যেভাবে রায় দিয়েছে এবং নওয়াজ শরীফকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যেভাবে অযোগ্য ঘোষণা করা হলো তা এমনিতেই নড়বড়ে হয়ে থাকা পাকিস্তানের গণতন্ত্রকে তছনছ করে দেবে।
পাকিস্তানের সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওয়াসিস তওহীদ (Owais Tohid) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, সংবিধানের ৬২ ও ৬৩ ধারা দুটি ইসলাম ধর্ম অনুসরণে সংবিধানে সংযু্ক্ত করা হয়েছে। আর পাকিস্তানের সাবেক স্বৈরশাসক জিয়াউল হকের সময় ১৯৮৫ সালে এটা করা হয়েছিল।
ওই সাংবাদিক প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনি সৎ ও বিশ্বাসযোগ্য কিনা সেটা কে নির্দেশ করবে? কে আপনাকে এই নিশ্চয়তা দিবে যে আপনি সৎ ও বিশ্বাসযোগ্য? এই বিচারের ভার কার ওপর ন্যস্ত থাকবে?
পাকিস্তানের অনেকেই মনে করেন, আদালতের এমন পদক্ষেপে এটাই বোঝা যায় যে নওয়াজ শরীফকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণ করাই ছিল এখানে মুখ্য। যে কোনো অজুহাতে তাকে পদচ্যুত করা হবে – এমনই এক ধরনের মানসিকতা লক্ষ্য করা যায় এই পুরো ঘটনার মধ্য দিয়ে। অন্যথায় এ ধরনের মামলা পরিচালনার দায়িত্ব পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি আদালতের (corruption trial court) ওপর ন্যস্ত করাই যুক্তিযুক্ত ছিল। এমন একটি ঘটনাকে ইস্যু করে তড়িঘড়ি করে একজন প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দেয়া দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর এক বড় আঘাত।
সাংবাদিক তাওহীদ আরো বলেন, পাকিস্তানের গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এই ঘটনার সুদূরপ্রসারি প্রভাব পড়বে। ভবিষ্যতে এই ধারা সংসদের অন্য সদস্যদের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতে পারে। আর খুব শিগগিরই আমরা সেটা দেখতে পাবো বলে আমার আশঙ্কা।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, যে যুক্তিতে পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণ করা হলো তা খুবই দুর্বল। কারণ এর আগে যে দুই মেয়াদে শরীফ ক্ষমতায় ছিলেন তখন তিনি ও তার পরিবার এর থেকে অনেক বড় বড় দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কাদা ছোঁড়াছুড়ি
এদিকে, আলোচিত ‘পানামা পেপারস’কেলেংকারী সংক্রান্ত প্রতিবেদনে শরীফ ও তার পরিবারের সদস্যরা কিভাবে কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে লন্ডনের পুশ পার্ক লেনে (London's posh Park Lane) অনেকগুলো অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয় করেছেন তার উল্লেখ রয়েছে। বিচারাধীন অন্যান্য মামলার সাথে এই পানামা পেপারস অভিযোগও ফৌজদারি আদালতে বিচারের জন্য দাখিল করা হয়েছে।
পাকিস্তানের আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক নুসরাত জাভেদ (Nusrat Javed) বলেন, যেসব অভিযোগে শরীফকে অপসারণ করা হলো তা খুবই দুর্বল। প্রকৃত অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় তাকে অপসারণ করাই ছিল (আদালতের) মূল অভিপ্রায়।
অবশ্য কারো কারো মতে, যেসব ঘটনার প্রেক্ষিতে শরীফকে পদচ্যুত করা হলো তাতে পাকিস্তান যে তার টালমাটাল গতানুগতিক গণতান্ত্রিক ধারা থেকে কিছুটা সরে এসেছে সেটাই প্রমাণিত হয়েছে।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক “দি ডন (Dawn)” পত্রিকার কলাম লেখক উমায়ের জাভেদ (Umair Javed) অবশ্য নওয়াজ শরীফের পদত্যাগের এই ঘটনাকে একেবারেই ভিন্নধর্মী বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, তার পদত্যাগের পেছনে একেবারে সুনির্দিষ্ট ভিত্তি (পানামা পেপারস কেলেংকারি) রয়েছে। এটা তার বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র নয়।
তিনি অবশ্য এমন শঙ্কা উড়িয়ে দিতে চান না যে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে কেউ লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কিন্তু তাই বলে বর্তমান বাস্তবতায় যারা পদক্ষেপ নিয়েছেন তাদেরকে আপনি দোষারোপ করতে পারেন না।
পাকিস্তানের ইতিহাসে এ পর্যন্ত দেশটির সেনাবাহিনী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি তিনটি অভ্যুত্থান (coups) করেছে। এছাড়া আরো অনেকবার ক্ষমতার পালাবদলের নেপথ্যের খলনায়কের ভূমিকায় ছিল সেনাবাহিনী।
তবে, নওয়াজ শরীফের এবারের পদচ্যুতির ঘটনাটি নানা কারণে কিছুটা ঘোলাটে। এমনকি এই ঘটনায় দেশটির বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিভক্ত হয়ে পড়েছে। দেশের সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ, রাজনৈতিক শক্তিসমূহ এবং সর্বোপরি গণমাধ্যম রীতিমতো এক ধরনের কাদা ছোঁড়াছুড়িতে লিপ্ত রয়েছে এই ঘটনাকে ঘিরে। সাংবাদিক তাওহীদ এমনটাই মনে করেন। “আর সে কারণেই আমরা এখন সামনে কেবল বিশৃঙ্খলাই দেখছি”।
তবে, এই সিনিয়র সাংবাদিকের মতে, এর অর্থ এটা নয় যে দেশটির সেনাবাহিনী কিংবা বিচার বিভাগ ক্ষমতা দখল করতে চাইছে। প্রকৃত অর্থে এই দুই নিয়ন্ত্রন সংস্থা চাইছে নিজ নিজ অতীত অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে। অর্থাৎ- ভবিষ্যতে ক্ষমতার পালাবদলে তারা নেপথ্যের নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে চাইছেন।
আর এমনই বাস্তবতায় ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগও কিছুটা কৌশলী ভূমিকায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়ে কোন ধরনের অন্তর্দ্বন্দ্বে যেতে চায় না দলটি। তারা চান যেন কোন একজন দলটাকে কোনমতে টেনেটুনে আগামী ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত নিয়ে যাক। এই মুহুর্তে আর কোনভাবেই যেন মুসলিম লীগের ইমেজ ক্ষুন্ন না হয় এবং কোন অপ্রীতিকর ঘটনাই যেন আসছে নির্বাচনকে ব্যহত না করে সেদিকেই দৃষ্টি দলটির।
অপরাপর রাজনৈতিক দলও অবশ্য সেটাই চায়। তবে, মুসলিম লীগকে অজনপ্রিয় করার সব সুযোগকে তারা অবশ্যই কাজে লাগাবে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে।আর এই পরিস্থিতিতে নওয়াজ শরীফের পক্ষে পিছনের সুখস্মৃতি মনে করে হলেও কিছুটা মানসিক সান্তনা খোঁজা ছাড়া আপাতত কিছু করার আছে বলে মনে করেন না বিশেষজ্ঞরা। (সহায়ক সূত্র: আলজাজিরায় প্রকাশিত আসাদ হাশিমের কলাম অবলম্বনে)





