একদিকে নিজের দলীয় এমপি-মন্ত্রীসহ সহযোগীরা, অন্যদিকে বিরোধী দলের এমপিদের চাপের মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দু’পক্ষকে সামলাতে গিয়ে চরম বিড়ম্বনায় পড়েছে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি’র নিয়ন্ত্রকরা।

অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছে, দলীয় এমপিদেরই এখন সবক শেখাতে হচ্ছে নরেন্দ্র মোদিকে। প্রধানমন্ত্রী দলীয় এমপিদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘সীমারেখা লঙ্ঘন করবেন না!'  

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সাধ্বী নিরঞ্জন জ্যোতি ও এমপি সাক্ষী মহারাজসহ অন্যদের বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে পার্লামেন্টে বিপাকে পড়েছে বিজেপি। ১৬ ডিসেম্বর, বিজেপি সংসদীয় বোর্ডের বৈঠক ছিল। সেই বৈঠকে দলীয় এমপিদের কোনোরকম মন্তব্য করার আগে সীমার মধ্যে থাকার আদেশ দিয়েছেন মোদি।  

দলের এমপিদের প্রতি মোদির স্পষ্ট বার্তা,  বিতর্কিত মন্তব্য ছেড়ে উন্নয়নের দিকে মন দিতে হবে। আসলে, ভোটের আগে মোদি যে সুশাসন ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেসব এখন পেছনে চলে যাচ্ছে উগ্র হিন্দুত্বের প্রচারকদের দাপটে। 

মোদি তাই নিজ দলের এমপিদের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ‘দলের নীতি অনুসরণ করুন। যেখানে সেখানে যার যা মনে আসছে তা বলা বন্ধ করুন। নইলে বিরোধীরা সুবিধা পেয়ে যাবে। অন্য ইস্যু ছেড়ে ধর্মীয় বিভাজনকেই সামনে নিয়ে এসে রাজনীতি করে যাবে যা আসলে উন্নয়ন কর্মসূচি আটকে দেয়ার চক্রান্ত।’

এর আগে বিজেপি সাংসদ সাধ্বী নিরঞ্জন জ্যোতি দিল্লিতে ভোটপ্রচারে গিয়ে 'রামজাদে' ও 'হারামজাদে' মন্তব্য করে সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলেছিলেন। তিনি একটি নির্বাচনী প্রচার সভায় বলেছিলেন, ‘দিল্লীতে রামজাদার সরকার হবে না হারামজাদার তা আপনাদেরই ঠিক করতে হবে।’

মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসেকে দেশপ্রেমী আখ্যা দিয়েছিলেন  বিজেপি’র আর এক সাংসদ সাক্ষী মহারাজ।

বিরোধীদের চাপের মুখে পার্লামেন্টে  প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে মন্ত্রী সাধ্বী নিরঞ্জন জ্যোতির সামাজিক ও আর্থিক দিকের প্রসঙ্গ টেনে তাকে ক্ষমা করে দেয়ার আবেদন জানিয়ে বিবৃতি দিতে হয়। 

শেষমেশ ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন সাধ্বী নিরঞ্জন জ্যোতি এবং  সাক্ষী মহারাজ। মোদিকেও যথেষ্ট  অস্বস্তিতে পড়তে হয় নিজ এমপিদের কাজকর্মে।

ধর্মান্তরকরণ নিয়ে বিজেপি এমপি যোগী আদিত্যনাথ মন্তব্য করেছেন, ‘যদি কোনো হিন্দু আগে কোনো কারণে ধর্মান্তরিত হয়ে থাকেন, তাহলে ঘর ওয়াপসী (ঘরে ফেরা) বা ধর্মান্তরকরণ মেনে নেয়া উচিত।’

তার দাবি, ‘কেউ স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরকরণে রাজি হলে এতে কোনো ভুল নেই। স্বাধীনতার আগে বা পরে লোভ দেখিয়ে, জোর করে অসংখ্য হিন্দু পরিবারকে ধর্মান্তর করা হয়নি কি?’  

উত্তরপ্রদেশের গভর্নর রাম নায়েক ‘রাম মন্দির দেশবাসীর স্বপ্ন’ বলে মন্তব্য করেও বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। 

সম্প্রতি ভারতের আগ্রায় কতিপয় মুসলিম পরিবারের ২০০ জনকে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করার কথা গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। হিন্দুত্ববাদীরা আগামী ২৫ ডিসেম্বর আলীগড়ে মুসলিম ও খ্রিস্টান মিলিয়ে ৫০০০ জনকে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করার ঘোষণা দেয়।

বিজেপি এমপি যোগী আদিত্যনাথ ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছিলেন। সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশ প্রশাসন এই অনুষ্ঠানের অনুমতি না দেয়ায় আপাতত তা বন্ধ রয়েছে।

'ধর্ম জাগরণ সমন্বয় বিভাগ’-এর সদস্য  রাজ্যেশ্বর সিং  অবশ্য বলেছেন, ‘২৫ ডিসেম্বরের ওই অনুষ্ঠান পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। তা কখনোই বাতিল করা হয়নি। পরে কোনো দিন ওই অনুষ্ঠান হবে।’

সম্প্রতি হিন্দু ধর্মগ্রন্থ 'গীতা'কে জাতীয় গ্রন্থ হিসাবে ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। ভগবত গীতার ৫,১৫১ বছর পূর্তি উপলক্ষে দিল্লীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে  বক্তব্য রাখতে গিয়ে সুষমা স্বরাজ একথা বলেন। 

এসব নিয়ে দেশ জুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের মধ্যে সংসদে বিজেপি সরকারকে চেপে ধরেছে বিরোধীরা। কার্যত হিন্দুত্ববাদীদের সাম্প্রতিক কাজকর্মকেই অস্ত্র করে তাদেরকেই অসুবিধায় ফেলতে অনেকটাই সক্ষম হয়েছে বিরোধীরা। সূত্র: আইআরআইবি।

দেশের রাজনৈতিক ময়দানে এসব নিয়ে এতটাই বিতর্কের ঝড় উঠেছে  যে, গত কয়েকদিন ধরে বিরোধীদের বিরোধীতায় উত্তাল হয়েছে লোকসভা এবং রাজ্যসভা। দফায়, দফায়  বাধাগ্রস্ত বা বাতিল হয়েছে পার্লামেন্টের রাজ্যসভা ও লোকসভার কাজকর্ম। এসব নিয়ে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি।