মিশরীয় স্বৈরশাসক আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শাসনের দুই বছর পূর্তি আজ।

এমন সময় এই দুই বছর পূর্তি হচ্ছে যখন মিশর কার্যত রক্তের সাগরে ভাসছে।

বুধবার মিশরের সেনাবাহিনীর উপর গত চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইব্রাহিম মেহলেবই বলেছেন যে মিশর এখন ‘যুদ্ধাবস্থায়’।

দুই বছর আগে ২০১৩ সালের ৩ জুলাই কথিত গণবিক্ষোভের অজুহাতে তৎকালীন সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী সিসি মিশরের ৫ হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত এক গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্টকে, মোহাম্মদ মুরসি, উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন।

পরে জানা যায়, মিশরের সেই কথিত মুরসি বিরোধী গণবিক্ষোভ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরতান্ত্রিক রাজাদের টাকায় সাজানো এক নাটক- যার মূল কথা ছিল মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তম ইসলামী সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডকে ক্ষমতায় থেকে সরিয়ে মিশরকে এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করে আরব জাহানের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশটিকে ইসলামবিরোধীদের ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেয়া।

প্রথম বছর খানেক উর্দি পোশাকে এবং পরে প্রহসনের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আরা এক বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন সিসি।

সিসির ক্ষমতা দখলের পর গত দুই বছরে কতটা এগুলো মিশর?

এক বাক্যে বললে মিশর এখন এক ভূনরকে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন লাশ পড়ছে ইসলামপন্থী ও গণতন্ত্রীদের। বেশুমার মরছে দেশটির বর্বর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও।

সিসির ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রায় ৪০০০ গণতন্ত্রপন্থীকে হত্যা করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর অন্ত ছয়শ’ সদস্যরাও মারা গেছে এ সময়ে।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নতি তো দূরের কথা, প্রতিদিন তারা পিছিয়ে যাচ্ছেন। সিসির সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য প্রায় দ্বিগুণ করেছে।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, মিশর এখন বিশ্বের বৃহত্তম উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। দেশটির কারাগারে এখন বন্দি অন্তত ৪৪,০০০ রাজনৈতিক নেতাকর্মী।

সিসি আদালতকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করে মুসলিম ব্রাদারহুডের শত শত নেতাকর্মীকে ফাঁসির দণ্ড আর দীর্ঘমেয়াদী সাজা দিচ্ছেন।

সর্বোচ্চ দণ্ড থেকে বাদ যাননি মুরসি এবং ইসলামী বিশ্বের খ্যাতনামা আলেম ইউসুফ আল-কারজাবিও।

অথচ মুরসির বিরুদ্ধে কানাকড়ি দুর্নীতির অভিযোগও আনতে পারেনি সিসির সরকার, যদিও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সরকার প্রধানরা বিদায় নেয়ার পর দুর্নীতির অভিযোগই ওঠে সর্বাগ্রে।

সিসি মিশরের কোনো কল্যাণ করতে না পারলেও দেশটিকেই সলামী জঙ্গিদের উবর ভূমিতে পরিণত করেছেন। মিশর এই জঙ্গিতন্ত্র থেকে আর বের হতে পারবে কিনা তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েছে। যেমন পাকিস্তানের সাবেক স্বৈরশাসক পারভেজ মোশারফের নীতির কারণে দেশটি ইসলামপন্থী জঙ্গিদের আখড়ায় পরিণত হলে সেখানে থেকে আর বেরুতে পারছে না কিছুতেই।

জঙ্গিরা মিশরের মহাশক্তিধর এবং আরব জাহানের বৃহত্তম সেনাবাহিনীকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে গণ্ডায় গণ্ডায় হত্যা করছে। বুধবার একদিনেই অন্তত ৬৪ সেনাকে হত্যা করেছে তারা।

অন্যদিকে জঙ্গি দমনের নামে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী অসহায় মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে যদিও মুসলিম ব্রাদারহুড একটি উৎকৃষ্ট গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের নাম।

দুই বছর পূর্তিতে এএফপির মূল্যায়ন

সাবেক স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ৬ এপ্রিল শুরু হওয়া গণঅভ্যুত্থানের তরুণ কর্মী মোহাম্মদ নাবিল বলেন, মিশরের সর্বপ্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির ক্ষমতাচ্যুত করার দুই বছর পর স্বৈরশাসকের দমন-নিপীড়ন, বিরোধীদেরকে নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও হত্যাগুমের মাঝে মিশরের সর্বস্তরে রাজনৈতিক ব্যর্থতা প্রকট হয়ে উঠেছে।

ভীত-সন্ত্রস্ত মিশরীয়রা আল-সিসিকে সমর্থন করতে বাধ্য হচ্ছে। আল-সিসি সরকারের দমন-পীড়ন অভিযান প্রথমত মোহাম্মদ মুরসির সমর্থকদেরকে টার্গেট করে চালানো হয়। প্রেসিডেন্ট মুরসির উৎখাতের কয়েক সপ্তাহ পরেই কায়রোতে দু’টি মুরসিপন্থী শিবিরে এক পুলিশি আক্রমণে কয়েকশ নেতা-কর্মী নিহত হন।

এরপর দ্রুতই অভিযান শুরু হয় সেক্যুলার কর্মীদের টার্গেট করে যারা হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল এবং প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আল-সিসিকে সমর্থন করেছিল।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ মিশরীয় সরকার বর্তমানে বিরোধীদের উপর অভূতপূর্ব মাত্রায় নির্যাতন-নিপীড়ন চালাচ্ছে এবং বিরোধীদের নিষ্পেষণে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করছে।

লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হাসিবা হাজ সাহরায়ী বলেছেন, সরকারের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরণের চ্যালেঞ্জ-হুমকি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার যে প্রচেষ্টা মিশর সরকার চালিয়ে যাচ্ছে, তা কোনোক্রমেই তারা থামাবে বলে মনে হচ্ছে না।

এদিকে বিচার বিভাগের প্রধান কৌঁসুলি হিশাম বারাকাত হত্যা ও বুধবারের আইএস হামলা আল-সিসিকে আরো ক্ষুদ্ধ করে তুলেছে।

প্রহসনের বিচারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের দণ্ড দ্রুত কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন আল-সিসি। এছাড়া দ্রুত বিচার ও হামলায় নিহতদের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য বুধবার মন্ত্রীসভা এক সন্ত্রাস বিরোধী আইন পাস করেছে।

দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির গবেষক এরিক ট্রেগার বলেন, বহু মিশরীয় রাজনৈতিক অস্থিরতার ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে এবং মিশরের বড় শহরগুলোতে জঙ্গি হামলার উত্থানে ভয়ের কারণে তারা এই দমন-পীড়ন অভিযানকে সমর্থন করছে।

আরেকটি বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ যেটা এই মুহূর্তে আল-সিসির সামনে সেটা হচ্ছে মিশরের অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করা।

মিশরের অর্থনীতি মূলত ঐতিহ্যগত পর্যটন নির্ভর। আর এই পর্যটন নির্ভর অর্থনীতির বার্ষিক জিডিপি ৭ ভাগে উন্নিত করা আল-সিসির সরকারের লক্ষ্য।

আল-সিসির সরকার ক্ষমতায় আসার পর মিশরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই পর্যটন খাতে হঠাৎ ধস নামে। ২০১০ সালে যেখানে ১ কোটি ৫০ লাখ পর্যটক দেশটিতে ভিড় জমিয়েছিল সেখানে গত বছর সেটা ১ কোটিতে নেমে এসেছে।

দেশটিতে বর্তমানে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতির মতো সংকটে রয়েছে। শতকরা ১৩.৫ ভাগ মুদ্রাস্ফীতি ও ১২ ভাগ বাজেট ঘাটতি আল-সিসি সরকারের দুটো মূল উদ্বেগের ব্যাপার।

কায়রোভিত্তিক সিগনেট থিঙ্ক ট্যাঙ্ক-এর প্রধান নির্বাহী প্রখ্যাত অর্থনীতি বিশ্লেষক আনগুস ব্লেয়ার বলেন, মিশরের চলমান অর্থনৈতিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধি শতকরা প্রায় ৫ ভাগ। কিন্তু দেশটির বার্ষিক ২.৬ ভাগ হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার হওয়া দরকার ৭ থেকে ৮ ভাগ।

এসএইচ