ব্রিটিশ তরুণদের সমর্থন অর্জন এবং যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে দেশটির শিক্ষার্থী, অধিকার কর্মী এবং সংসদীয় দলগুলোকে অর্থ ও অন্যান্য কৌশলগত সহায়তা দিয়ে নিজেদের পক্ষে কাজ করতে প্রলুব্ধ করে ইসরায়েল। আল জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
গত ছয় মাস ধরে এ নিয়ে একটি ইসরায়েল সমর্থক দলের মধ্যে ঢুকে অনুসন্ধান চালিয়েছে গণমাধ্যমটির প্রতিবেদক রবিন (ছদ্মনাম)। অবৈধভাবে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখলবিরোধী আন্দোলন প্রতিহতে কাজ করে দলটি।
লন্ডনে ইসরায়েল দূতাবাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শাই মাসোতের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ, অধিকার কর্মী এবং বিশ্লেষকদের সম্পর্কও উন্মোচন করেছেন আল জাজিরার ওই প্রতিনিধি।
যুক্তরাজ্যে ইসরায়েলবিরোধী ‘বয়কট, ডাইভেস্টমেন্টন অ্যান্ড স্যাঙ্কশন্স’ (বিডিএস) আন্দোলন জমে ওঠা এবং ফিলিস্তিনিদের স্বার্থের পক্ষে কথা বলা জেরেমি করবিন বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতৃত্বে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই লবিং শুরু করে ইসরায়েল।
সম্প্রতি ব্রিটেনে ব্যাপক সমর্থন পেতে শুরু করেছে বিডিএস। ২০১৫ সালের জুনে বয়কটের পক্ষে ভোট দেয় প্রভাবশালী ব্রিটিশ ছাত্রসংগঠন ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টস (এনইউএস)। এর এক বছর পরই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম এবং নারী হিসেবে মালিয়া বুত্তিয়াকে সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত করে এনইউএসের সদস্যরা।
তবে বিডিএস আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে যুক্তরাজ্যের ইহুদি ছাত্রদের সংগঠন ইউনিয়ন অব জিউস স্টুডেন্টস (ইউজেএস)। এই সংগঠনটি মূলত দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৪টি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইউজেএস ইসরায়েলি দূতাবাস থেকে শুধু অর্থই গ্রহণ করে না, এনইউএসের সভাপতি নির্বাচনকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা করে তারা। বুত্তিয়া সংগঠনটির সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে উৎখাতেরও চেষ্টা করেছিল ইউজেএস।
বুত্তিয়াকে ‘প্রকৃতই খারাপ’ এবং ‘ভয়ঙ্কর’ আখ্যা দিয়ে ইসরায়েলপন্থি ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি কর্মকর্তা মাইকেল রুবিন জানান, তিনি বুত্তিয়ার বিরুদ্ধে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত এবং দূতাবাসের সঙ্গে কাজ করেছেন। রুবিন বলেন, ‘আমরা তার বিরুদ্ধের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছি। কারণ আমরা চাইনি, তিনি জয়ী হন।’
নির্বাচনের সময় ইউজেএসের প্রচারণা বিষয়ক পরিচালক রাসেল লাঙ্গার এবং রুবিনের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করেছেন এনইউএসের ভাইস-প্রেসিডেন্ট বিচার্ড ব্রুকস। এনইউএস বর্তমানে ৪০ লাখের বেশি ব্রিটিশ শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্ব করে।
ইউজেএসের সভাপতি পদে একবার নির্বাচন করে ব্যর্থ হয়েছিলেন অ্যাডাম শেলপিরা। আল জাজিরার ছদ্মবেশি প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের ইসরায়েলি দূতাবাস ইউজেএসকে অর্থ দেয়।’ ব্রিটিশ শিক্ষাঙ্গনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলপন্থি লবি এআইপিএসি অর্থ দেয় বলেও নিশ্চিত করেছেন শেরপিরা। তার ভাষায়, ‘এআইপিএসির মতো গোষ্ঠিগুলো কিছু অর্থ দেয়।’
তদন্তকালে আল জাজিরা প্রতিনিধি রবিন একজন বিডিএসবিরোধী ইসরায়েলপন্থি গ্রাজুয়েট হিসেবে ছদ্মবেশ ধারণ করে ছিল। ইসরায়েলি কূটনীতিক মাসোত তাকে জোর দিয়ে বলেন, ব্রিটিশ লেবার পার্টির সব পর্যায়ে ইসরায়েলের জন্য সমর্থন তৈরি করাই তার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এক পর্যায়ে লেবার পার্টির লেবার ফ্রেন্ডস অব ইসরায়েল (এলএফআই) নামের লেবার পার্টির একটি যুব শাখায় তাকে চাকরি দেয়ার প্রস্তাব দেয় মাসোত।
লেবার পার্টির থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ফাবিয়ান সোসাইটির সঙ্গে জড়িত থাকার কথাও স্বীকার করেন তিনি। বিরোধীদের প্রভাবিত করতে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ওই ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত।
এর আগে আল জাজিরার গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি নির্মাণবিরোধী ব্রিটিশ রাজনীতিবিদদের উৎখাত চেষ্টার এক ভিডিও প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে ক্ষমা চায় লন্ডনে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত মার্ক রেগেভ।
ভিডিওতে দেখা যায়, লন্ডনের এক রেস্টুরেন্টে বসে ইসরায়েলি দূতাবাসের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মকর্তা শাই মাসোত ব্রিটেনের শিক্ষামন্ত্রী রবার্ট হাফলনের সহযোগী মারিয়া স্ট্রিজোলোর সঙ্গে কথা বলছেন। মারিয়া ফ্রেন্ডস অব ইসরায়েলের সাবেক রাজনৈতিক পরিচালক এবং একজন গোপন প্রতিবেদক।
কথোপকথনে মাসোত ফিলিস্তিনিদের প্রতি দুর্বলতা পোষণ করেন এমন কয়েকজন পালার্মেন্ট সদস্যকে উৎখাত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মারিয়ার কাছে এমন কয়েকজন ব্রিটিশ এমপির নাম জানতে চান, যারা ফিলিস্তিনিদের প্রতি দুর্বল। সূত্র: আল জাজিরা
মাহমুদ





