বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির আদেশ অতিসত্ত্বর বাতিল করা উচিত বলে মন্তব্য করেছে নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
আজ (সোমবার) বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা ৬ মিনিটে সংগঠনটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে পাঠানো এক প্রেসবার্তায় এমন দাবি জানানো হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের দেয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশের চূড়ান্ত রায়ের বিরুদ্ধে গত ৫ই মে মাওলানা নিজামীর রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার পর একমাত্র বিকল্প রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সময়সীমা শেষ হলেই যে কোন সময় রায় কার্যকর করা হবে বলেও প্রেসবার্তায় জানানো হয়।
এতে বলা হয়, মাওলানা নিজামীর অধীনে থাকা বাহিনীর হাতে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে যুদ্ধাপরাধ হয়েছে বলে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তারই ভিত্তিতে দেশে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Crimes Tribunal -ICT) ২০১৪ সালে নিজামীর বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশ দেয়।
আরও বলা হয়: “Several prominent international observers have expressed serious concerns over previous death penalty convictions handed down by the ICT due to concerns over fair trials”. অর্থাৎ-“ন্যায়বিচার ইস্যুতে এই ট্রাইব্যুনালের দেয়া ইতিপূর্বের মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিয়ে বিশ্বের বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত পর্যবেক্ষক এরই মধ্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।”
আন্তর্জাতিক এই মানবাধিকার সংগঠনটির এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস (Brad Adams) বলেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যে কোন পরিস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ডকে স্থায়ী সমাধান মনে করে না। এটাকে অমানবিক ও নিষ্ঠুর শাস্তি হিসেবেই বিবেচনা করে সংগঠনটি।
তদুপরি ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নিয়ে সংশয় থাকলে তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয় মন্তব্য করে অ্যাডামস বলেন: “It is particularly problematic when there are questions about whether proceedings meet fair trial standards”. অর্থাৎ-“বিশেষত এটা একটা সমস্যারই বিষয় যখন বিচার প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচারের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।”
প্রেসবার্তায় আরও বলা হয়, ট্রাইব্যুনালে মামলা চলাকালে আদালত নিজামীর পক্ষের সাক্ষী সংখ্যা ন্যায়ভ্রষ্টভাবে নির্দিষ্ট করে দেয়। এতে মাওলানা নিজামী তার বিরুদ্ধে আনা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। শেষ পর্যন্ত নিজামীর পক্ষে মাত্র চারজন সাক্ষীকে আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়।
প্রেস বার্তায় উল্লেখ করা হয়: “He was not allowed to challenge prosecution witnesses who allegedly had offered prior inconsistent testimony.” অর্থাৎ- সরকারের পক্ষে প্রসিকিউশন টিমের দেয়া সাক্ষীদের আদালতে অসংলগ্ন সাক্ষ্য প্রদান সত্বেও ওই সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ দেয়া হয়নি নিজামীর আইনজীবীদের।
ট্রাইবুনালের একজন বিচারকের বিচার চলাকালীন সময়ের স্কাইপ কেলেংকারী প্রসঙ্গে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রেসবার্তায় বলা হয়: “Conversations leaked to the Economist as part of the “Skypegate” scandal also revealed that the Nizami trial was unlawfully discussed by the presiding judge, the prosecution, and an external consultant, who were heard debating trial strategies.”
অর্থাৎ-দি ইকোনোমিস্ট পত্রিকায় স্কাইপ কেলেংকারীর যে তথ্য ফাঁস হয়েছে তাতেও প্রকাশ হয়েছে কিভাবে নিজামীর বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বেআইনীপন্থায় একজন চলমান বিচারক, প্রসিকিউশন এবং বহিরাগত পরামর্শক আলোচনা করেছেন। একটি বিতর্কিত বিচারের কৌশল (strategies) চূড়ান্ত করতে তারা যা করছিলেন তা তাদের মুখেই শোনা গেছে ওই স্কাইপ কেলেংকারীর মধ্য দিয়ে।
প্রেসবার্তায় বলা হয়, “Human Rights Watch strongly supports the need for justice and accountability for war crimes committed during Bangladesh’s 1971 conflict but has pointed out numerous shortcomings in ICT proceedings leading to flawed judgments and, in some cases, hangings, despite well-documented fair trial concerns.”
অর্থাৎ-হিউম্যান রাইটস ওয়াচ খুব জোরালোভাবেই চায় যে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ চলাকালে যে যুদ্ধাপরাধের ঘটনা ঘটেছে তার সুষ্ঠু বিচার হোক। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যেভাবে ত্রুটিপূর্ণ বিচার (flawed judgments) হচ্ছিল তার অনেকগুলো দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল ন্যায়বিচারের প্রশ্নে। কিন্তু সেগুলো আমলে নেয়া হয়নি।
এছাড়া, বিচার চলাকালে শুধুমাত্র ফাঁসি নিশ্চিত করতেই কিভাবে আইন সংশোধন করা হয়েছিল তারও সমালোচনা করা হয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রেসবার্তায়।
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এনে যাদের বিচার করা হচ্ছে তাদের মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়ে আবারও বাংলাদেশ সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রেস বার্তায় সংবিধানের বিতর্কিত ৪৭এ(১) ধারার বিষয়েও সরকারের পদক্ষেপ কামনা করা হয়।
সংবিধানের সমস্যাগ্রস্থ ওই ৪৭এ(১) ধারায় বলা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা করা হবে না। দ্রুত বিচার করার ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালও এর আওতায় থাকে। সংবিধান সংশোধন করে আনা এই ক্ষতিকর অনুচ্ছেদের কারণে বিচক্ষণ বিচারকগণ অন্যান্য আসামিদের মত যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের আইনগত অধিকার ও বিচার প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করেছে।
এই আর্টিকেলের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন ও পক্ষপাতহীন আদালতে বিচার পাওয়ার যে অধিকার অভিযুক্তদের রয়েছে তা অনেকটাই খর্ব হয়েছে বলেও প্রেসবার্তায় দাবি করা হয়।
কেবি





