মিয়ানমারে আড়াই দশক পর সবদলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়েছে জনগণ। বড় কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই মিয়ানমারে বহু প্রতীক্ষার ভোট শেষ হয়েছে।

এখনও কোনো বুথফেরত জরিপের খবর না মিললেও অং সান সু চির দল এনএলডি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দীর্ঘকাল সেনা শাসনে থাকা দেশটিতে আড়াই দশক পর সব দলের অংশগ্রহণে ভোট হয় রোববার।

কড়া নিরাপত্তায় স্থানীয় সময় ভোর ৬টায় শুরু হয়ে একটানা বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। তবে ভোটের সময় শেষ হওয়া পর্যন্ত যেসব কেন্দ্রে ভোটাররা লাইনে ছিলেন তাদের ভোটও নেওয়া হয়।

বিচ্ছিন্ন কিছু অনিয়ম ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবেই ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে বলে পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন।

ভোটগ্রহণ শেষেই শুরু হয়েছে গণনা। রাত থেকেই পর্যায়ক্রমে ফল ঘোষণা করা হবে বলে ইউনিয়ন ইলেকশন কমিশন থেকে জানা গেছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, ভোটের সার্বিক চিত্র পেতে মঙ্গলবার সকাল নাগাদ অপেক্ষা করতে হবে।

নির্বাচনে ৯২টি দল অংশ নিলেও সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি-এনএলডির সঙ্গে সেনা সমর্থিত ক্ষমতাসীন দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেমোক্রেটিক পার্টি-ইউএসডিপির যে মূল লড়াই হবে,তা স্থানীয়দের কথায় স্পষ্ট।

যে তালিকায় এ ভোট হয়েছে,তাতে ভোটার প্রায় তিন কোটি। তাদের ভোটে ৪৪০ আসনের পার্লামেন্ট ‘পিথু হালতাউয়ের’ (প্রতিনিধি পরিষদ) ৩৩০ জন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন। বাকি ১১০ আসন সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত।

ভোট দিতে সু চি সকালে ইয়াঙ্গুনের একটি কেন্দ্রে পৌঁছালে অনেক মানুষ সেখানে জড়ো হন। বরাবরের মতো খোঁপায় থাজিন ফুলের তোড়া গুঁজে ভোট কেন্দ্রে যাওয়া সু চির মুখে এ সময় হাসি দেখা যায়। হাত নেড়ে উপস্থিতদের অভিবাদন জানালেও কোনো কথা না বলেই সেখান থেকে চলে যান তিনি।

ভোট দেওয়ার পর ছোট গাড়িবহর নিয়ে নিজের নির্বাচনী এলাকা কাউমোতে যান সু চি।

ইয়াঙ্গুন থেকে ৬৪ কিলোমিটার দূরের এই শহরে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পৌঁছান তিনি। সেখানে বেশ কয়েকটি কেন্দ্র পরির্দশন করে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন এনএলডির নেত্রী।

দেশটির প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন ও পার্লামেন্টের স্পিকার সুইয়ে মান উভয়ে স্ত্রীসহ রাজধানীতে ভোট দেন। তারা ভোট কেন্দ্রে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে লাইনে ছিলেন।

সকাল ৬টায় ভোট শুরু হলেও দেশের অনেক স্থানে কেন্দ্রগুলোতে ভোরের আগে থেকেই সারিবদ্ধভাবে ভোটারদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

ইয়াঙ্গুনের ডাউন টাউনের বাণিজ্যিক এলাকার তিন কেন্দ্রের ভোটারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ভোর হওয়ার আগেই অনেকে ভোট কেন্দ্রে যান; যাদের বেশিরভাগ ছিলেন নারী।

সেখানকার একটি দোকানের বিক্রয়কর্মী কিন ইয়াদানা মুইয়ের সঙ্গে কথা হয় ভোট শুরু হওয়ার কিছু সময় পর।

তিনি বলেন, “আমাদের অনেকদিনের প্রত্যাশা এই ভোটকে নিয়ে। তাই সকাল সকাল কেন্দ্রে এসে ভোট দিয়েছি। আমাদের স্বজনরা তাদের ভোট কেন্দ্রে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন বলে মোবাইলে জানিয়েছেন।”

“আমি যখন ভোট দিই তখন খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম এবং হাত কাঁপতে থাকায় কোনো ভুল করে ফেলি কি না সে ভয় পাচ্ছিলাম,” ভোট দেওয়ার পর বলেছেন সু চির নির্বাচনী আসন কাউমোর বাসিন্দা কে খিন সোয়ে।

ইয়াঙ্গুন শহরের ভোট কেন্দ্রগুলোতে সকাল থেকে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। ডাউন টাউন, তাকিতা টাউনশিপ, বোথাম টাউনশিপ, হোলিং টাউনশিপ ও ইয়াকতাদা টাউনশিপের ভোট কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে,বেলা ১২টা পর্যন্ত ভোটারদের উপস্থিতি বেশি থাকলেও দুপুরের পর অনেক কেন্দ্র ফাঁকা হতে শুরু করে।

তবে শহরের বাইরের চিত্র ছিল ভিন্ন। সেখানকার অনেক কেন্দ্রে দুপুরের পরও ছিল ভোটারদের দীর্ঘ লাইন।

বহুল আলোচিত এই নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কারণে প্রায় দুইশ’ পর্যবেক্ষককে তা পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে বিদেশি সাংবাদিক ও সংবাদ সংস্থাগুলোর উপর কড়াকড়ি রয়েছে।

আসিয়ান সচিবালয় থেকে যাওয়া আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দুরুদি সিরিচানিয়া রয়টার্সকে বলেন, “সকাল ৬টা থেকে কয়েক ডজন লোকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা নিরাপদ পরিবেশেই ভোট দিতে পারার কথা জানিয়েছেন।”

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শান্তিতে নোবেলজয়ী সু চির দল ভোটে জয়ী হলে সেনাবাহিনী তা মেনে নেবে কি না- তা নিয়ে সন্দিহান অনেক ভোটার।

তবে প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক,তাকে ‘সম্মান জানানোর’ আশ্বাস দিয়েছেন।

আর দেশটির সেনা কমান্ডার ইন-চিফ মিন অং হ্লাইং বলেছেন,১৯৯০ সালের পুনরাবৃত্তি এবার হবে না।

সে সময় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে সু চির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সামরিক জান্তা ফল প্রত্যাখ্যান করায় ক্ষমতা গ্রহণ দূরে থাকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি মেলেনি সু চির। এর পর ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত অধিকাংশ সময় গৃহবন্দিত্বেই কেটেছে তার।

রোববার রাজধানীতে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সেনা কমান্ডার বলেন, “যদি জনগণ তাদের বেছে নেয় তাহলে আমাদের মেনে নিতে আপত্তি থাকার কোনো কারণ নেই।”

তবে দল জিতলেও বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না শান্তিতে নোবেলজয়ী সু চি; যদিও তিনি বলে রেখেছেন, দল জিতলে প্রেসিডেন্টের চেয়ে বড় কিছু হবেন তিনি।

২০০৮ সালে মিয়ানমারের সংবিধান সংশোধনের সময় রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন,সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব প্রদান,পার্লামেন্টে তাদের জন্য ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষণসহ বেশ কিছু ধারা সংযোজন করা হয়।

সংবিধানের ৫৯ (এফ) ধারায় বলা হয়েছে,যদি কেউ কোনো বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করেন এবং তার সন্তানরা অন্য দেশের নাগরিক হয়ে থাকেন,তাহলে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না।

সংবিধান সংশোধনের প্রতিবাদে ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত ভোট বর্জন করে এনএলডি। পরে ২০১২ সালের উপ-নির্বাচনে ৪৫টি আসনের মধ্যে ৪৩টিতে জয়ী হয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে তারা।

এমআর