ভারতে করোনার ভয়াবহ দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ায় ভারত আপাতত করোনা টিকা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ায় বাংলাদেশে করোনা টিকাদান কর্মসূচিতে তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা।

বাংলাদেশের ১৪ লাখের বেশি মানুষের দ্বিতীয় ডোজ করোনার টিকা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মেঘ যেন কাটছেই না। এ পরিস্থিতিতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে ‘ভারত-বাংলাদেশ সোনালি অধ্যায়’নামে একটি রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায়। বাংলাদেশের প্রায় ১৬ লাখ মানুষ ভারতীয় করোনা প্রতিষেধকের প্রথম ডোজ নিয়ে বসে রয়েছেন।

ঢাকা সূত্রের বক্তব্য, বিষয়টি আর চাপা থাকছে না সে ভারতে। যার  প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাঙালির প্রিয় মাছ ইলিশ প্রসঙ্গে। ভারতে ইলিশ রফতানিতে দীর্ঘদিন ধরেই নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বাংলাদেশের। তা সত্ত্বেও গত বছর জামাই ষষ্ঠীর সময়ে পশ্চিমবঙ্গে দু’হাজার টন ইলিশ রফতানিতে  ছাড়পত্র দিয়েছিল বাংলাদেশ  সরকার। কিন্তু এ বছর পশ্চিম বঙ্গের পাতে এখনো পড়েনি পদ্মার ইলিশ।

প্রসঙ্গত, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওঠাপড়ায় ইলিশ এক কূটনৈতিক প্রতীকও বটে। এর আগে স্থলসীমান্ত চুক্তি সই করতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ঢাকায় গিয়েছিলেন, ইলিশ নিয়ে কিছুটা রসিকতার ঢংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা হয়েছিল তাঁর। ভোজের তালিকায় ইলিশের পঞ্চপদ দেখে মমতা প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে প্রশ্ন করেছিলেন, কেন তাঁরা ইলিশ আটকে রেখেছেন? হাসিনার জবাব ছিল, “তিস্তার পানি এলেই মাছ সাঁতার কেটে চলে যাবে ও পারে!”

বাংলাদেশ তিস্তা চুক্তি রূপায়ণ নিয়ে সেই আবেগ আপাতত সংযত রেখেছে । কিন্তু সে দেশের রাজনৈতিক সূত্রের মতে, গত এক বছরে পর পর এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যে বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মেজাজকে সামলানো কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে হাসিনা সরকারের পক্ষে। ঘরোয়া ভাবে স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে, ইচ্ছা না-থাকলেও চীনকে প্রতিষেধক ক্ষেত্র খুলে দিতে বাধ্য হচ্ছে ঢাকা। ইতিমধ্যেই বেজিং-এর উপহার হিসাবে প্রায় ১১ লক্ষ ডোজ চিনের প্রতিষেধক ঢাকায় পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ সূত্রের দাবি, টিকার বিষয়টি নিয়ে গেল মার্চে ঢাকা সফরেও প্রধানমন্ত্রী মোদী কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ার পর বাংলাদেশ, ভুটান, শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশগুলিতে টিকা রফতানি স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয় সাউথ ব্লক।

বাংলাদেশের বক্তব্য, টিকার ব্যাপারে ভারতের কাছ থেকে এতটাই আশ্বাস পাওয়া গিয়েছিল, তখন আগ্রহী চীনকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সূত্রের খবর, গত বছর আগস্টে চীনের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে টিকাকরণের প্রাথমিক আলাপ আলোচনা শুরু করেছিল। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ঠিক তখনই ঢাকা যান বিদেশসচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। প্রতিষেধক-কূটনীতিকে তখন চরম গুরুত্ব দিয়েছে মোদী সরকার। সব গুটিয়ে তখন চীনা দলকে ফিরে যেতে দেখা যায় বাংলাদেশ থেকে।

সম্প্রতি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে দেশের অন্যান্য প্রান্ত থেকে পণ্য পাঠানোর জন্য চট্টগ্রাম বন্দর এবং বিমানবন্দর ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ ভারতীয় পণ্যের যাত্রাপথের বড় অংশে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভূমিকা থাকছে। ঢাকার রাজনৈতিক সূত্রের বক্তব্য, ভারত নিয়ে সে দেশের মানুষের মন যদি বিগড়ে থাকে, তা হলে এই সংযোগ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

হোসাইন নূর