সম্প্রতি ধর্ষণের ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর আনুপাতিক হারে এগিয়ে যাচ্ছে ভারত। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন যেমন নারী সমাজ তেমনি উদ্বিগ্ন ভারতের মোদী সরকার।

কারণ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুইটি আলোচিত ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। যে ঘটনাগুলোর সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিল ভারতে মোদি সরকারের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির স্থানীয় নেতারা। পৃথিবীতে মেয়েদের জন্য অনিরাপদ দেশগুলোর মধ্যে এখন ভারত একটি।

ধর্ষণ কেন্দ্রিক আলোচনায় আসার পর সম্প্রতি ভারতে ন্যাশানাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে বলা হয় ২০১৬ সালে প্রায় ৪০ হাজার ধর্ষণ কেস ফাইল হয় ভারতে। এর মধ্যে কিশোরী ও শিশুর সংখ্যা প্রায় ৫৭ শতাংশ।

তার আগে ২০১৫ সালে ভারতের ধর্ষণ নিয়ে এক পরিসংখ্যান প্রতিবেদন প্রকাশ করে ন্যাশানা্ল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো। যেখানে বলা হয়, ২০১৫ সালে মোট ৩৪ হাজার ৬৫১টি ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়।

অর্থ্যাৎ ভারতে প্রতিদিন ৯৫টি ধর্ষণ হচ্ছে। প্রতি ঘন্টায় হচ্ছে ৪টি আর প্রতি ১৫ মিনিটে একটি করে ধর্ষণ হচ্ছে।

পরিসংখ্যানে আরও উল্লেখ করা হয় প্রায় ৯ শতাংশ ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে পরিবারের আপন মানুষগুলো দ্বারা। আর ২৭ শতাংশ ঘটছে পরিচিত প্রতিবেশীদের দ্বারা।

উল্লেখ্য, ভারতের ন্যাশানাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো করা এই প্রতিবেদনে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ষণের অভিযোগগুলো নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু এর বাহিরেও ভয়ানক আকারে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে যেগুলো প্রাণের ভয়ে বা নিরাপত্তার অভাবে অভিযোগ করতে পারছে না ভিকটিম পরিবারগুলো।

২০১২ সালে ভারতের দিল্লিতে এক ছাত্রী গণধর্ষণ হয়। তার পর থেকে ভারত ধর্ষণ বিষয়ে আইন পরিবর্তনসহ এ বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া সরকার। ২০১২ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ধর্ষণের ওপর একটি বেসরকারী পর্যবেক্ষণ জরিপে বলা হয়, ভারতে বছরে দ্বিগুণ হারে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে এবং বাড়ছে।

শিশু অধিকার রক্ষা সংক্রান্ত সংস্থা 'ক্রাই' এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাবালকদের বিরুদ্ধে অপরাধ গত ১০ বছরে ৫০০ শতাংশ বেড়েছে।

প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, এ ধরনের অপরাধের ৫০ শতাংশ পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশে নথিভুক্ত।

১৫ শতাংশ শুধু উত্তরপ্রদেশেই। পশ্চিমবঙ্গে শিশু সুরক্ষা কমিশনের চেয়ারপারসন অনন্যা চক্রবর্তীর মতে, শিশু নিগ্রহ আগেও হতো। কিন্তু বিষয়গুলো সামনে আসত না। বাবা-মা, অভিভাবক সামাজিক লজ্জা-অপমানের ভয়ে বিষয়গুলোকে লুকিয়ে রাখতেন। এখন দিন বদলেছে।

যে কারণে বাড়ছে ভারতে ধর্ষণ:

ভারতে ধর্ষণের পেছনে অনেক ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও কারণ দেখিয়েছে বিশ্লেষকরা। তাদের মতে প্রধান কিছু কারণ আছে যেগুলো ঠিক করলে প্রাথমিকভাবে ধর্ষণে এই ভয়াবহতা ঠেকানো যাবে। কারণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ,,,,,

১/ বিচারহীনতা: আন্তর্জাতিক এক গণমাধ্যমে উল্লেখ করতে গিয়ে ভারতে একজন আইনজীবী আবি সিং জানান, ভারতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৮ শতাংশ ধর্ষণ মামলার মোটামুটি বিচার করা হয়। বাকি ৭২ শতাংশ কোন না কোন ভাবে বিচারের আওতায় আসছে না। যার কারণে কেউ ধর্ষণের বিচার নিয়েও আসতে চায় না।

কারণ ধর্ষক জেল থেকে কোনভাবে বের হয়ে আবার হয়রানি শুরু করবে। অবশ্য এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে গিয়ে গতকাল একটি আইন পাশ করে মোদি সরকার। যেখানে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুকে ধর্ষণ করলে তার মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়।

২/ পুলিশের সহযোগীতার অভাব: ভারতে ধর্ষক দ্বারা নির্যাতিত হওয়ার পরে নারীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয় পুলিশের কাছ থেকে। এ ক্ষেত্রে সম্প্রতি আলোচনায় আসা দুইটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। কাশ্মিরে ৮ বছরের শিশু আসিফা ধর্ষণ মামলার সরাসরি আসামি এক পুলিশ কর্মকর্তা, যে আসিফা মরে যাওয়ার পরেও তাকে ধর্ষণ করতে চেয়েছিল।

অপর দিকে ভারতের উত্তর প্রদেশে ১৬ বছরে এক কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় মামলা করলে পুলিশ আসামিকে বাদ দিয়ে উল্টো ধর্ষিতার বাবাকে গ্রেফতার করে। থানায় পুলিশের নির্যাতনের কারণে ধর্ষিতার বাবার এক পর্যায়ে মৃত্যু হয়।

৩/ রাজনীতির বলি: বর্তমানে ক্ষমতাসীন মোদি সরকারের রাজনৈতিক দল বিজেপি। এই মাসে দুই ধর্ষণের আলোচনার ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততা এবং ভূমিকা অনেকাংশে এই সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

কারণ আসিফার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রথমদিকে অপরাধীদের পক্ষে সাফাই গাইতে দেখা যায় কয়েকজন বিজেপি নেতাদের। যার কারণে বিষয়টি সাম্প্রদায়িক চত্রুান্ত বলে ফুলে উঠে বিশ্ব সমাজ।

অন্যদিকে উত্তর প্রদেশে ১৬ বছর বয়সী কিশোরীকে সরাসরি ধর্ষণ করে উত্তর প্রদেশের ক্ষমতাসীন বিজেপির বিধায়ক কুলদীপ সিং সেনগার। ধর্ষণের প্রথম দিকে পুলিশ মামলা নিতে চায় নি। মামলা নেয়ার পর উল্টো ধর্ষিতার বাবাকে গ্রেফতার করে থানায় অতিরিক্ত নির্যাতন করে মেরে ফেলে। সর্বশেষ মেয়েটি বাকি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসাথে আত্মহত্যার হুমকি দিলে পুলিশ এই বিজেপি নেতাকে গ্রেফতার করতে বাধ্য হয়।

এছাড়া ভারতে সামাজিক অবক্ষয়সহ পুরুষ ও মহিলার অনুপাত অনেক বড় কারণ হয়ে দাড়াচ্ছে ধর্ষণের। কারণ বর্তমান অনুপাত ১০০:১১২।


জেড