বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের তিন দিনের বৈঠক শুরু হচ্ছে আজ (সোমবার)। বাংলাদশের রাজধানী ঢাকায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিন দিনের বৈঠকে আলোচনার এজেন্ডার মধ্যে থাকছে সীমান্ত হত্যা, সীমান্ত অপরাধ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ছিটমহল বন্টনের পর উদ্ভুত পরিস্থিতি, সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও অপরাধমূলক কর্মকান্ড এবং গরু চোরাচালানসহ দুই দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়।

বিশেষ করে চলতি (২০১৫) বছরের জুলাই পর্যন্ত ছিটমহলে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনকারী বাসিন্দাদের সমস্যা সমাধানে উভয় দেশ নিজেদের মধ্যে ছিটমহল বন্টন করে নেয়ার পর এর কী প্রভাব পড়েছে তা নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে অমীমাংসিত ছিটমহলের যে বন্টন সম্পন্ন হলো তার খুঁটিনাটি দিক নিয়ে বৈঠকে খোলামেলা আলোচনা হবে।

উল্লেখ্য, ছিটমহল বিনিময় সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে এত দিন পর্যন্ত ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ছিটমহল বাংলাদেশ ফেরত পেয়েছে এবং একইভাবে বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ভারতের ছিটমহল ফেরত পেয়েছে প্রতিবেশী দেশটি।

১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্ত চুক্তি এবং ২০১১ সালের প্রটোকল অনুযায়ী - ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের ৬৮ বছর পর ছিটমহলকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যেকার সীমান্ত সমস্যার নিষ্পত্তি হয়েছে।

দু' দেশের সরকারের হিসেব অনুযায়ী ভারতের মধ্যে বাংলাদেশের ৫১ টি এবং বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ১১১ টি ছিটমহল রয়েছে। এসব ছিটমহলে মোট ৫৫ হাজার মানুষের বসবাস।

কিন্তু কিছু ছিটমহলের বাসিন্দারা কোন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করবেন সে বিষয়ে ৩১শে জুলাই ২০১৫-র ডেডলাইনের মধ্যে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা সম্প্রতি পরিবর্তন করায় জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হবে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হওয়ার আগে দুই দেশের যৌথ অংশগ্রহণে যে জরিপ সম্পন্ন হয়েছিল তাতে দেয়া তথ্যের সাথে ছিটমহলের বাসিন্দাদের বর্তমান মানসিকতারও গড়মিল দেখা দিয়েছে।

বিশেষ করে ছিটমহলের বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ভারত বা বাংলাদেশকে বেঁছে নেয়ার যে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিল সেটা কতটা কার্যকর হলো তা নিয়েও কিছুটা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। দুই দেশের স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে নাগরিকত্ব পরিবর্তনে আগ্রহী ছিটমহলবাসীদের বিষয়টির সূরাহা হবে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

গত ৩১শে জুলাই মধ্য রাতের এক মিনিট পূর্বেই অমীমাংসিত ছিটমহলের বাসিন্দাদের যে কোন একটি দেশের নাগরিকত্ব বেছে নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী যারা নাগরিকত্ব পছন্দ করেছেন তাদের অনেককেই এখনও সংশ্লিষ্ট দেশ নাগরিকত্ব প্রদান করেনি। এ নিয়েও দেখা দিয়েছে জটিলতা।

এদিকে, বাংলাদেশের কারাগারে আটক ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী (স্বাধীনতাকামী) নেতা অনুপ চেটিয়াকে তার অপর দুই সহযোগীসহ গোপনে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পাঁচ দিন পরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র সচিবদের এই বৈঠক। অনুপ চেটিয়া ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম সংক্ষেপে 'উলফা' নামে বহুল পরিচিত ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী (স্বাধীনতাকামী) সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা।

এদিকে, অনুপ চেটিয়াকে ফেরত দেয়ার পর পরই ভারতের কারাগারে আটক বাংলাদেশের নারায়নগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার প্রধান আসামী নুর হোসেনকে ফেরত দেয় ভারত।

তিন দিনের স্বরাষ্ট্র সচিবদের বৈঠকে ভারতের কারাগারে বেশ কয়েক বছর ধরে আটক আরও কয়েক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে বাংলাদেশ ফেরত চাইবে বলেও সূত্র জানিয়েছে।

এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে (২০১৫) ভারতের রাজধানী দিল্লীতে অনুষ্ঠিত দুই দেশের স্বরাষ্ট্র সচিবদের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফএর হাতে বাংলাদেশী নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সীমান্তে হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বিএসএফ-এর হাতে প্রতিনিহত নিহত হচ্ছেন নিরীহ বাংলাদেশী নাগরিক।

উল্লেখ্য, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তিতে স্পষ্ট বলা আছে, কেউ সীমান্তে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করলে বা অপর কোন অপরাধের প্রচেষ্টা চালালে তাকে ধরে সংশ্লিষ্ট দেশে হস্তান্তর করা হবে, কিন্তু হত্যা করা যাবে না। অথচ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ প্রতিনিয়ত এই গাইডলাইন লংঘন করছে।

ভারত বাংলাদেশকে এই মর্মে আশ্বস্ত করেছিল যে, সীমান্তে হত্যা বন্ধে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফকে সীমান্তে আগ্নেয়াস্ত্র (lethal weapons) ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হবে না। কিন্তু  ভারতের সাথে বাংলাদেশের ৪ হাজার ৯৮ কিলোমিটারের দীর্ঘ স্থল সীমান্তে ভারত বার বার এই প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করে চলছে।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের দেয়া জরিপ অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিএসএফ হত্যা করেছে ১,০৩৫ বাংলাদেশী নাগরিককে। এছাড়া, বিএসএফের হামলায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৯১৯ বাংলাদেশী।

বিগত ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ১৫ বছরের বাংলাদেশী কিশোরী ফেলানি খাতুনকে নির্মমভাবে হত্যা করে কাটাতারে ঝুলিয়ে রেখেছিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ। এ ঘটনায় বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠেছিল দেশটির বিরুদ্ধে।

অপর এক সূত্রে আরও জানা যায়, বাংলাদেশ ও ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে গরু চোরাচালান এবং অনুপ্রবেশের বিষয়।

দি ইকোনমিক টাইমস জানিয়েছে, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব রাজীব মেহরিশি বাংলাদেশে গরু পাচার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেশটির স্বরাষ্ট্রসচিব মো. মোজ্জাম্মেল হক খানকে অনুরোধ করবেন।

একটি সরকারি হিসাব মতে, ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু পাচার হওয়ার হার ৭০ শতাংশ কমে গেছে। যার ফলাফল হিসেবে সেখানে গরুর মাংসের দাম তুলনামূলকভাবে বেড়ে গেছে।

গত সেপ্টম্বর মাসে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়েছিলেন যে, প্রতি বছর ২০ থেকে ২২ লাখ গবাদি পশু বাংলাদেশে পাচার হয়ে যায়। যা বর্তমানে দুই থেকে আড়াই লাখে নেমে এসেছে।

দুদিনের এই বৈঠকে ভারতীয় প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ বিষয়টি নিয়েও আলোচনা করবেন। সেই সঙ্গে এই অনুপ্রবেশ বন্ধে কী কী পদক্ষেপ বা কৌশল গ্রহণ করা যায় সে বিষয়েও আলোচনা করা হবে। ক্ষমতায় আসার আগে এই বিষয়টি বিজেপির নির্বাচনী ইস্যুও ছিল।

এদিকে, ত্রিপুরা সীমান্তে বাংলাদেশের সীমান্ত ফাঁড়ি তৈরি করতে বাংলাদেশকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত। এই ফাঁড়িটির জন্য নির্ধারিত স্থানে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হওয়ায় ফাঁড়ি তৈরি করতে ভারতের মাটি ব্যবহার করে প্রকৌশলী, কাঁচামাল এবং শ্রমিক পরিবহন করতে অনুমতি চেয়েছে বাংলাদেশ। বৈঠকে এ বিষয়েও আলোচনা হবে।

স্বরাষ্ট্র সচিবদের এই বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন স্বরাষ্ট্র সচিব মো: মোজাম্মেল হক খান এবং ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকবেন দেশটির স্বরাষ্ট্র সচিব রাজিব মেহরিশি।

কেবি