৪৮ ঘণ্টার টালবাহানা শেষে,অভ্যন্তরীণ সব চাপ অগ্রাহ্য করে ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। গতকাল শনিবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব মহিউদ্দিন ওয়ানি জানান,প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ সোমবার নরেন্দ্র মোদির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দিল্লি আসবেন। পরের দিন দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর সন্ধ্যায় ইসলামাবাদ রওনা হবেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে মোদি সার্ক সদস্যভুক্ত দেশের সরকারপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানান। সব দেশ এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেও সংশয় ছিল নওয়াজ শরিফকে নিয়ে। শনিবার তারও অবসান ঘটল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পূর্বনির্ধারিত দ্বিপক্ষীয় সফরে জাপান যাওয়ায় তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে আসছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। অবশ্য কিছুটা ‘টেনশন’ রয়েছে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের উপস্থিতি নিয়ে। তামিলনাড়ুর সব রাজনৈতিক দলই রাজাপক্ষকে আমন্ত্রণ জানানোর বিরোধিতা করেছে। এর প্রতিবাদে মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা এই অনুষ্ঠান বয়কট করবেন বলে শোনা যাচ্ছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রনায়কদের আমন্ত্রণ জানানোর এই সিদ্ধান্তকে অধিকাংশ দেশ ও দলই স্বাগত জানিয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে। পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছে, এর ফলে দুই দেশের সরকারপ্রধানদের বোঝাপড়ার পথ প্রশস্ত হবে। কংগ্রেসও একে ইতিবাচক মনোভাব মনে করে। মোদিও তাই ঠিক করেছেন, এই সুযোগে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পরের দিন আট রাষ্ট্রপ্রধান অথবা তাঁদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবেন। অবশ্য, এ ধরনের আলোচনা প্রথামাফিক হয় না। কিন্তু তা না হলেও এর মাধ্যমে পারস্পরিক চেনাজানার পর্বটি সারা হয়ে যায়। নওয়াজ শরিফের দিক থেকে আমন্ত্রণ গ্রহণ কিন্তু খুব একটা সহজ ছিল না। তিনি ও তাঁর দল আমন্ত্রণ পেয়ে উৎফুল্ল হলেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাঁর ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি হচ্ছিল। পাকিস্তানে ক্ষমতার উৎস একাধিক। নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার, সেনাবাহিনী, আইএসআইয়ের পাশাপাশি উগ্র মৌলবাদী সংগঠনও রয়েছে। এমনই এক সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবা, যার প্রতিষ্ঠাতা হাফিজ সাঈদ প্রবলভাবে এই আমন্ত্রণের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতোই বিরোধিতা করেছেন দেশের সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফ। আইএসআইও প্রধানমন্ত্রী শরিফের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মত দিয়েছে। শুক্রবার আফগানিস্তানের হেরাতে ভারতীয় হাইকমিশনের ওপর যে হামলা হলো, কেউ কেউ মনে করছেন, তা পাকিস্তানের আলোচনাবিরোধী শক্তিদেরই কাজ। এই মহল মনে করে, আফগানিস্তানের সরকারবিরোধী তালিবানি গোষ্ঠীদের নিয়ন্ত্রণ এখনো পাকিস্তানেরই হাতে। কিন্তু প্রধানত নিজের দল এবং বিরোধী নেতা খুরশিদ আহমেদ শাহর উৎসাহ ও সমর্থন শরিফকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহসী করে তোলে। দুজনেই মনে করেন, আলোচনাই সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায়। তা ছাড়া, দুই দেশের গরিব মানুষদের স্বার্থেই বন্ধ থাকা আলোচনা শুরু হওয়া উচিত। সব রাষ্ট্র থেকে এই অভাবিত সাড়া মেলায় ভাবী প্রধানমন্ত্রী মোদিও খুশি। বিজেপিতে এই মুহূর্তে মোদির বিরোধিতা প্রায় নেই বললেই চলে। দলের এক প্রথম সারির নেতা শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘কয়েক মাস আগেও আমাদের দলের যাঁরা প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে পাকিস্তান সফরে যেতে নিষেধ করেছিলেন, যাঁরা বলেছিলেন ২৬/১১-র অপরাধীদের শাস্তি না দেওয়া হলে আলোচনার প্রশ্ন ওঠে না, তাঁরা কিন্তু আজ মুখে কুলুপ এঁটেছেন। অথচ, চার মাস আগের পরিস্থিতি আজও অপরিবর্তিত।’ বিপুল জনসমর্থন পেয়ে ক্ষমতায় আসার এই সুফলটাই মোদি ব্যবহার করতে চাইছেন। সেখানে আপাতত তিনি সফল। নওয়াজ শরিফের সঙ্গে তাঁর ‘চরিত্রগত’ মিলও রয়েছে। শরিফ পাকিস্তানের বড় শিল্পপতিদের একজন। তিনি ব্যবসায়ীদেরও কাছের বলে পরিচিত। মোদিও গুজরাটি। গুজরাট ও শিল্প-উদ্যোগ প্রায় সমার্থক। দুজনেই মনে করেন, দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি পারস্পরিক বৈরিতা ঘোচানোর ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। দুজনই তাই দুজনকে ভালোভাবে জানতে আগ্রহী। সোম ও মঙ্গলবার সেই জানাজানির পর্বে শরিফ ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে পাকিস্তান সফরে আমন্ত্রণও জানাবেন। কাল সোমবারের শপথ অনুষ্ঠানের একমাত্র সম্ভাব্য কাঁটা শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের উপস্থিতি। তামিলনাড়ুর সব রাজনৈতিক দলই রাজাপক্ষের উপস্থিতির বিরোধিতা করছে। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার আসার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। রাজাপক্ষকে এমডিএমকে নেতা ভাইকো কালো পতাকা দেখাবেন বলে জানিয়েছেন। বিজেপির মধ্যে তাই অন্য একটা আশঙ্কাও কাজ করছে। অনুষ্ঠান চলাকালে তামিল সাংসদেরা রাজাপক্ষের বিরুদ্ধে স্লোগান দেবেন না তো? কিংবা কালো পতাকা প্রদর্শন? তা হলে? দলের এক সাংসদ এই আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, তেমন হলে কারও কিছু করারও তো নেই। নির্বাচিত সাংসদেরা যদি শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ দেখান, তাঁদের তো বের করে দেওয়াও যাবে না৷ খামোখা অনুষ্ঠানের গাম্ভীর্য নষ্ট হবে। সোমবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করা সত্ত্বেও এই একটি আশঙ্কা সরকারের মাথার ওপর ডেমোক্লিসের খাঁড়ার মতো ঝুলে রয়েছে। [b]ঢাকা,২৫ শে মে (টাইম নিউজবিডি.কম)/কেএ[/b]