আট লাখ রুপি! সে যে অ-নে-ক! এত টাকা কোথা থেকে আসবে, তা ভেবে কুল পাননি দরিদ্র দম্পতি স্বরূপ আর বীণা পণ্ডিত। একসঙ্গে আট হাজার টাকা জোগাড় করাই যে তাদের পক্ষে মুশকিল৷
তাহলে কি তাদের একমাত্র ছেলে বছর ১৩'র অভিষেকের ব্লাড ক্যান্সারের চিকিৎসা হবেই না? চিন্তায় ঘুম আসে না পণ্ডিত দম্পতির৷ অথচ মুম্বাইয়ের টাটা ক্যান্সার রিসার্চ মেমোরিয়ালের ডাক্তাররা একটু হলেও তো আশার আলো দেখিয়েছেন৷ বলেছেন, 'যদি আর না ছড়ায় রোগ, তাহলে সেরে উঠবে অভিষেক৷ তবে সে জন্য খরচ হবে প্রায় ৮ লক্ষ রুপি৷'
ডাক্তারের কথা শুনে মুখ শুকিয়ে যায় স্বরূপ আর বীণার৷ যে ২ লক্ষ টাকা পুঁজি নিয়ে তারা রওনা দিয়েছেন, তাও প্রায় শেষ তত দিনে৷
আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি অভিষেকের বাবা৷ মুম্বাই থেকে ফোনে একই গ্রামের বাসিন্দা ও তার দীর্ঘ দিনের বন্ধু শিলাদিত্য পালকে সব কিছু জানান৷ পেশায় কৃষিজীবী শিলাদিত্য বন্ধুকে ভেঙে না পড়ার সান্ত্বনা দেন ঠিকই, তবে নিজেই কেমন যেন দিশেহারা হয়ে পড়েন৷
ছেলেটার এই অবস্থা শুনে আর স্থির থাকতে পারেননি শিলাদিত্যবাবুর স্ত্রী বন্দনাও৷ যে সামান্য ক'টা সোনার গয়না ছিল তার, তা বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করার জন্য নির্দ্বিধায় তা তুলে দেন স্বামীর হাতে৷ তার কথা শুনে এগিয়ে আসেন টুম্পা ধাড়া, খেয়ালি বাগের মতো গাঁয়ের আরও অনেকে৷ যার যতটুকু স্বর্ণালঙ্কার ছিল, বন্ধক রাখার জন্য তা তুলে দেন৷
প্রথম পর্যায়ে ৫৭ হাজার টাকা ওঠে৷ বন্ধক রেখে টাকা নেওয়ার জন্য ব্যবহার
করা হয় পরিমল পাল নামে এক জনের অ্যাকাউন্ট৷ অভাবী স্বরূপকে এক দিন থাকার জন্য জায়গা দিয়েছিলেন তিনি৷
অভিষেককে সুস্থ করে তোলাই এখন একমাত্র লক্ষ্য গোটা গ্রামের৷ কখনও বাসস্ট্যান্ডে, কখনও রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে অভিষেকের চিকিৎসার জন্য অনুদান তুলতে শুরু করেন তারা৷ জোগাড় হয় আরও ১ লক্ষ ৩৮ হাজার টাকা৷
কিন্তু এভাবে তো পুরো খরচ উঠবে না৷ দরকার আরও বড় কোনও সাহায্য৷ শিলাদিত্যবাবু এবার যান বর্ধমান টাউন স্কুলে৷ সেই স্কুলেরই ছাত্র অভিষেক৷ তার কথা শুনে ভেঙে পড়েন প্রধান শিক্ষক শঙ্করপ্রসাদ নন্দী৷ নোটিশ দিয়ে সমস্ত কথা জানিয়ে সাহায্যের আবেদন করেন স্কুলের সকলের কাছে৷ শিলাদিত্যবাবুকেও একটি চিঠি লিখে দেন৷ সেই চিঠি নিয়ে শিলাদিত্যবাবু শহরের অনান্য বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছেও যান, সাহায্যের জন্য৷
বর্ধমান টাউন স্কুলের প্রধান করণিক দিব্যেন্দু চক্রবর্তী বলেন, "পয়সার জন্য যাতে একটা ছেলের চিকিৎসা বন্ধ না হয়, তার জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি, পাশাপাশি আরও যাতে সাহায্য পায় তারও ব্যবস্থা করছি৷ অভিষেককে সুস্থ করতেই হবে।"
স্কুলের সাইকেল স্ট্যান্ডের দায়িত্বে থাকা সুশান্ত মিত্র ইতিমধ্যেই বিদ্যালয়ে আসা
অভিভাবক এবং অন্যান্য লোকদের থেকে টাকা তুলতে শুরু করেছেন৷
প্রধান শিক্ষক শঙ্করবাবু বলেন, "নোটিশ দেওয়ার পরেই আমাদের শিক্ষক-শিক্ষিকারা আমার কাছে এসে প্রস্তাব দিয়েছেন, নিজেরা যা পারবেন সে সাহায্য তো করবেনই, তাছাড়া ফিস্ট করার জন্য আমাদের স্টাফ কাউন্সিলের যে নিজস্ব টাকা রয়েছে, সে টাকাও দিয়ে দেবেন।"
ইংরেজির শিক্ষক আবির সামন্ত বলেন, "দেখুন, বিন্দু থেকেই সিন্ধু হয়৷ ছাত্রদের বলেছি, পুজোয় এবার খুব ভালো জামা না-ই বা কিনলাম, সেই খরচ কিছুটা বাঁচিয়ে যদি দিতে পারি ছেলেটাকে, তাহলে একটু তো অন্তত সুরাহা হয়।"
জেলা প্রশাসক সৌমিত্র মোহন সব শুনে অভিষেকের প্রতিবেশীদের বলেছেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে৷
আর জেলার পুলিশ সুপার সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন মির্জা গোটা ঘটনার কথা প্রতিবেদকের কাছে শুনে বলেন, "পুলিশের পক্ষ থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করা হবে সাহায্যের জন্য৷ খণ্ডঘোষ থানার ওসিকে বিস্তারিত খোঁজ নিতে বলছি।"
মুম্বাই থেকে ফোনে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে স্বরূপবাবু বলেন, "আমার ছেলেকে বাঁচাতে এখন ভরসা আপনারাই৷ আমার প্রতিবেশীরা এখনও অবধি যা করেছে, তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না৷ ৯ আগস্ট পর্যন্ত অভিষেক ভর্তি ছিল৷ দ্বিতীয়বারের কেমোর জন্য আবার ভর্তি হতে হবে ১৯ তারিখে।"
পলেমপুর গ্রাম যে মানবতা দেখাল, রক্তের বন্ধনহীন যে আত্মীয়তাকে প্রতিষ্ঠা করলো, তা কি বিরল নয়?
ঢাকা, ১৯ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএমএ





