মালয়েশিয়ায় ‘বাংলাদেশ নাইট’ নামে সংস্কৃতি সন্ধ্যা অনুষ্ঠানের আড়ালে শিল্পীদের সাথে শিল্পী ভিসায় মানব পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা অনন্য মামুন। তার সঙ্গে পাচার হওয়া ৫৭ জনকেও আটক করেছে মালয়েশিয়ার গোয়েন্দা পুলিশ।

রোববার দিবাগত রাত ১২টায় পুলিশের হাতে আটক হন অনন্য মামুন ও শ্যাম নামে তার এক সহযোগী। সেইসঙ্গে বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যাওয়া ৫৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে এ পাচার চক্রের সাথে ‘বাংলাদেশি নাইট’-এর স্পন্সর প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি বিশেষ জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে মালয়েশিয়ান গোয়েন্দারা।স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশিষ্ট অনেকে গ্রেফতার আতঙ্কেও রয়েছেন বলে জানা গেছে।

গত ২৩ ডিসেম্বর কুয়ালালামপুরের পেট্রনাস টুইন টাওয়ার সংলগ্ন ওয়াসমা এমসিআই হলে বিনোদনী সংস্থা ‘সিনেমাটিক’র আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘বাংলাদেশ নাইটস’। সেখানে যোগ দিতে চিত্রপরিচালক অনন্য মামুনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ২২ ডিসেম্বর রাতে মালয়েশিয়ায় যান বাংলাদেশের একঝাঁক তারকা। অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবর, আঁখি আলমগীর, এইচ এম রানা, ইউছুফ ও ব্যান্ডদল চিরকুট।
গানের সাথে নাচ পরিবেশন করেন চিত্রনায়ক ইমন ও নিরব এবং চিত্রনায়িকা শখ, আইরিন, ভাবনা, আমান ও মিষ্টি। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনায় ছিলেন চিত্রপরিচালক দেবাশীষ বিশ্বাস ও প্রবাসী সাংস্কৃতিক কর্মী আরুনিমা।

এর আগে গত ২৯ নভেম্বর কুয়ালালামপুরের বুকিত বিনতাং এলাকার ‘রসনা বিলাশ’ নামের একটি হোটেলে ঢামাঢোল পিটিয়ে অনন্য মামুন ও তার সহযোগিরা সংবাদ সম্মেলন করে ‘বাংলাদেশি নাইটস’ করার ঘোষণা দেন। সেখানে রসনা বিলাসের মালিক এস এম রহমান পারভেজ সহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ‘বাংলাদেশি নাইটস’ অনুষ্ঠান আয়োজনের আড়ালে অবৈধভাবে ৫৭ জনকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যান অনন্য মামুন ও তাদের সহযোগীরা। প্রত্যেকের কাছ থেকে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা করে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা নেয়া হয়। এ ছাড়া অনুষ্ঠানের স্পন্সরকৃত সকল প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও প্রায় এক কোটি টাকা নেয়া হয়। একই সাথে সাড়ে ৪ হাজার টিকিট বিক্রি করে আরো ৭০ লাখ টাকাসহ সর্বমোট প্রায় ৩ কোটি টাকা আয় হয় বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানায়, গ্রেফতারকৃতদের আপাতত পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে। মূলত এই তারকাদের সঙ্গেই পাচার হয়েছিলেন নাম-পরিচয় না জানা ওই ৫৭ জন বাংলাদেশি। তাদেরকে ‘শিল্পী’ হিসেবে ভিসা দিয়ে নেয়া হয়েছিল মালয়েশিয়ায়। কিন্তু সেখানে তাদের ভিসা ও পাসপোর্টের তথ্যে গড়মিল পাওয়া যায় শুরু থেকেই। এতে করে কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের সময়ই ১৫ জনকে আটক করে স্থানীয় গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ২৪ ডিসেম্বর রোববার রাতে কুয়ালালামপুরের পুত্রী হোটেল থেকে আরো ১৫ জনসহ বেশ কিছু জায়গায় অভিযান চালিয়ে সর্বমোট ৫৭ জনকে আটক করা হয়। তাদের সঙ্গে আটক হন পরিচালক অনন্য মামুন ও মালয়েশিয়া প্রবাসী শ্যাম নামে এক বাংলাদেশি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরো জানায়, মানবপাচার রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন পুলিশ। শিল্পীর নামে সেদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষকে পাচারের বিষয়টি সামনে আশায় নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ। বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা অনন্য মামুনের সাথে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মানবপাচারের সাথে জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে মালয়েশিয়ার গোয়েন্দা পুলিশ। সেক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশি নাইট’ অনুষ্ঠানের বাংলাদেশি স্পন্সর প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা আছে কিনা সেটাও আমলে নিয়ে তদন্ত করছে তারা। এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে গোয়েন্দা নজরদারিতে আছে বলেও জানা গেছে। অভিযোগের সত্যতা পেলে অভিযুক্ত স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা অনন্য মামুনসহ শিল্পী কলাকৌশলীরা রিজেন্ট এয়ারে করে মালয়েশিয়ায় যান। মূলত ওই অনুষ্ঠানের এয়ারলাইন্স পার্টনার ছিল রিজেন্ট এয়ার। নাম না প্রকাশ অনিচ্ছুক রিজেন্ট এয়ারের এক কর্মকর্তা জানান, চলচ্চিত্র পরিচালক অনন্য মামুনের কাছে ৫৯টি টিকেট বিক্রি করেছেন তারা। এখনো টিকেটের মূল্যবাবদ ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা পাবে রিজেন্ট এয়ার মালয়েশিয়ার অফিস এর এই কর্মকর্তা ।

তবে মানবপাচারে সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা রিজেন্ট এয়ারের মালয়েশিয়ার কান্ট্রি ম্যানেজার ইঞ্জিনিয়ার বাদুলুর রহমান খান বলতে পারবেন। এ ব্যাপারে আমার কিছু জানা নেই। তবে বাদলুর রহমান খান মালয়েশিয়ায় না থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অনুষ্ঠানের অন্যতম মিডিয়া পার্টনার ছিল উজার টিভি নামে ইউটিউভ অনলাইন চ্যানেল। চ্যানেলটির কর্মকর্তা জুনায়েদ আহমেদ মানবপাচারে তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমরা শুধু মিডিয়া পার্টনার হিসেবে অনুষ্ঠান প্রচার করেছি। কোনো প্রকার অর্থ লেনদেনের সাথে আমরা জড়িত নই।

অনুষ্ঠানে কো-স্পন্সর ছিল প্রাণ। প্রাণের মালয়েশিয়ার মার্কেটিং কর্মকর্তা সালেহীন জানান, মানবপাচারের বিষয়ে তারা ওয়াকিবহাল নন। কামরুজ্জামান নামের একজন তার সাথে যোগাযোগ করার প্রেক্ষিতে ৬০ হাজার টাকা স্পন্সর করা হয়েছিল।

‘বাংলাদেশ নাইট’ অনুষ্ঠানের আরেক রেস্টুরেন্ট পার্টানর ছিল কুয়ালালাপুরের বুকিত বিনতাং এলাকার ‘রসনা বিলাস রেস্টুরেন্ট’। রেষ্টুরেন্টের মালিক এস এম রহমান পারভেজ জানিয়েছেন ‘একজন সচেতন এবং সামাজিক মানুষ হিসেবে সবসময় ভালো কাজের পাশে থাকার চেষ্টা করি। বাংলাদেশি শিল্পীদের নিয়ে পরিচালক অনন্য মামুন যখন মালয়েশিয়ায় কনসার্টের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তখন তার পরিকল্পনাটা আমার ভালো লাগে। ফলে রসনা বিলাস তাতে স্পন্সর করে। কিন্তু কনসার্টের পর তার বিরুদ্ধে আদম পাচারের যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে এবং সেই অভিযোগে তাকে গ্রেফতারের যে কথা শোনা যাচ্ছে তা যদি সত্যি হয় তাহলে এটি খুবই দু:খজনক হবে।’

‘একজন চিত্রপরিচালকের এই ধরনের হীন কর্মকাণ্ড মেনে নিতে কষ্ট হয়’ জানিয়ে জাতীয় পার্টির মালয়েশিয়া শাখার এ সভাপতি বলেন, ‘আমি একজন সাধারণ প্রবাসী হিসেবে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। একইসঙ্গে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত পূর্বক সত্য উদঘাটনে বাংলাদেশ সরকার ও মালয়েশিয়া সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আইনানুগ পদক্ষেপ কামনা করছি।’

এ বিষয়ে মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দূতাবাসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে জানন, মানবপাচারের সাথে যেই জড়িত হোক না কেন, বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

দূতবাসের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা খুবই দু:খজনক ঘটনা। এ ঘটনা আবারও আমাদের জাতীয় ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’

এ ব্যাপারে মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. শহীদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, পরিচালক গ্রেফতার এবং মানবপাচারের অভিযোগটি আমাদের কানেও এসেছে। আমরা পুরো বিষয়টির প্রতি নজর রাখছি। দেশের বাইরে এসে এমন ঘটনায় জড়ানোর ব্যাপারটি খুবই অস্বস্তিকর।