সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর ২০১৫) এক আকস্মিক সফরে রাশিয়ার রাজধানী মস্কো যান। একদিনের ওই রহস্যময় সফরে প্রেসিডেন্ট আসাদ রাজধানী মস্কোয় দফায় দফায় বৈঠক করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে।
২০১১ সালের মার্চে সিরয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরুর পর এটাই প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের প্রথম কোন বহির্বিশ্ব সফর।
আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বের হুমকি-ধমকির তোয়াক্কা না করে সিরিয়ায় আইএস বিদ্রোহিদের ওপর বিমান হামলা শুরু করে ব্যাপক আলোচনায় আসা রাশিয়ায় আসাদের এই আকস্মিক সফরকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
১৯৭৯ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিউনের (বর্তমান রাশিয়া) আফগানিস্তানে সামরিক অভিযানের পর তিন যুগ পেরিয়ে গেলেও বর্হিবিশ্বে কোন একক সামরিক অভিযানে নামেনি রাশিয়া।
বিগত ৩৬ বছরে বিভিন্ন সময় এককালের প্রধান প্রতিদ্বন্দী আমেরিকার সাথে নানা ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও আমেরিকার মতো অন্য দেশে সামরিক অভিযানে নামতে দেখা যায়নি রাশিয়াকে।তাই হঠাৎ সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়ার সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে এমনিতেই চলছিল নানা চুরচেরা বিশ্লেষন।
আর এমনই পটভূমিতে বর্হিবিশ্ব থেকে গত চার বছর প্রায় বিচ্ছিন্ন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের রাশিয়া সফরে রীতিমতো নড়েচড়ে বসেছেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দ।
এদিকে, রাশিয়ায় দুই নেতার মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের ওপর চালানো যৌথ সামরিক অভিযান নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বুধবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের এক ব্রিফিংয়ে এই সফরকে নিয়মিত কর্মের অংশ হিসেবে (working visit) উল্লেখ করেছেন।
এদিকে, সিরিয়ার রাষ্ট্রপতির দফতর থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে, আসাদ ও পুতিনের মধ্যে তিন দফায় বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী সেরগে ল্যাভরভ এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সেরগে শইগু উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, তিনি আশাবাদী শিগগিরই সিরিয়া যুদ্ধের একটি সমাধান হবে। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে দেশটিতে বিদ্রোহীদের ওপর বিমান হামলা শুরু করে রাশিয়া।
প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, সবশেষ সামরিক অভিযানের ওপর ভিত্তি করে আমরা ধারনা করছি, সিরিয়ায় সব রাজনৈতিক দল এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীর সমন্বয়ে অতি দ্রুতই একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধানে পৌঁছা সম্ভব হবে।
তবে, যে কোন সিদ্ধান্ত আসতে হবে শুধুমাত্র সিরিয়ার জনগণের কাছ থেকেই-সিরিয়ায় আমেরিকার হস্তক্ষেপের প্রতি এভাবেই ইঙ্গিত দিয়ে পুতিন বলেন, সিরিয়া আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। সিরিয়াকে শুধু সামরিক সহায়তাই নয় যে কোন রাজনৈতিক সহায়তা দিতেও আমরা প্রস্তুত।
এদিকে, আসাদের রাশিয়া সফরের বিষয়টি একদিন পরে গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় ধারনা করা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট আসাদ রাশিয়া সফর শেষে নিজ দেশে নিরাপদে পৌছার পরই সংবাদটি প্রকাশ করেছে ক্রেমলিন।
ক্রেমলিন থেকে প্রাপ্ত এক বার্তায় আরও জানা যায়, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এ ধরনের আরও রাজনৈতিক পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
দুই রাষ্ট্রপতির বৈঠকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের দমনে বিমান হামলার মাধ্যমে সহায়তা করায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আসাদ।
প্রেসিডেন্ট আসাদ বলেন, সিরিয়া পরিস্থিতি আরও মর্মান্তিক পরিণতির দিকে যাবার আগে রাশিয়ার সাথে গৃহিত এই রাজনৈতিক পদক্ষেপ ইতিবাচক ফলাফলের ইঙ্গিত বহন করছে।
রাশিয়ায় আসাদের বক্তব্যের অনুবাদ থেকে আরও জানা যায়, তিনি পুতিনকে বলেছেন, আপনি দ্রুত পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়ে অ্যাকশনে না গেলে এই অঞ্চলে যে সন্ত্রাসবাদের সৃষ্টি হয়েছে তা ব্যাপকভাবে আরও বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়তো যার পরিণতি হতো আরও ভয়াবহ।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে মার্চে সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখ মানুষের প্রাণহানী ঘটেছে। এছাড়া, যুদ্ধের ভয়াবহতায় দেশটিতে বসবাসরত বাসিন্দাদের প্রায় অর্ধেকই গৃহহারা হয়েছেন।
আসাদের বক্তব্যের জবাবে পুতিন বলেছেন, সিরিয়ার ভাগ্য তার দেশের মানুষই ঠিক করবেন। কারণ এ ব্যাপারে একমাত্র দেশটির জনগণেরই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।
এদিকে, আসাদ সরকারের ঘোর বিরোধী তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী আহমেত দাভোতগলু এক প্রতিক্রিয়ায় বুধবার বলেন, সিরিয়ায় আসাদের প্রস্থান জরুরী হয়ে পড়েছে। সেখানে ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যেই রয়েছে সংকট থেকে উত্তরণের পথ।
তিনি বলেন, যেহেতু এত বছরেও সিরিয়া পরিস্থিতির কোন অগ্রগতি হয়নি। তাই আসাদের আর ক্ষমতায় থাকার কোন আইনগত ও নৈতিক অধিকার নেই। (সূত্র: আলজাজিরা, বিবিসি ও ইন্টারনেট)
কেবি





