২০১৪ সালে ফিলিস্তিনির গাজায় ইসরায়েলের সেনাবাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে নির্বিচারে সাধারণ মানুষের উপর নৃশংস হামলা চালিয়েছে। 'ব্লাক ফ্রাইডে' খ্যাত ওই হামলায় ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটি যুদ্ধাপরাধ করেছে- এমন স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে বলে এক গবেষণা প্রতিবেদন দাবি করা হয়েছে।

বুধবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি যৌথভাবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং ফরেনসিক আর্কিটেকচার তৈরি করেছে। তারা উল্লেখ করেছে, একজন সৈনিক নিখোঁজ হওয়ার জের ধরে ২০১৪ সালের ১ আগস্ট গাজার রাফায় আবাসিক এলাকায় বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ইসরায়েলি বাহিনী মানবতার বিরুদ্ধে যে যুদ্ধাপরাধ করেছে তার স্পষ্ট প্রমাণ আছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "ইসরায়েলি বাহিনী যে নির্বিচারে বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষ তাদের বাড়িতে, রাস্তায়, গাড়িতে জীবন হারিয়েছেন ও অনেকে আহত হয়েছেন, সে বিষয় অভিভুত হওয়ার মতো প্রমাণ আছে।"

"এই হামলায় তারা গণবসতিপূর্ণ এলাকায় বারবার গোলাবারুদ বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ও অন্যান্য অযথার্থ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে.... কোনো কোনো সময় তারা সরাসরি সাধারণ মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলেছে, এর মধ্যে পলায়নকারী মানুষও রয়েছে।"

শত শত ভিডিও, ছবি ও স্যাটেলাইট থেকে নেয়া ছবি বিশ্লেষণ এবং উভয় দলের প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষীর ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

২০১৪ সালের ১-৪ আগস্ট রাফায় হামাস যোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে মানবিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ করে ইসরায়েলি সেনারা। সেই ঘটনা প্রতিবেদনে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ওই ঘটনায় দুই জন ইসরায়েলি সেনা ও একজন হামাস যোদ্ধা নিহিত হয়েছিলেন। আরেক ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট হাদার গোল্ডিনকে আটক করেছিলেন যোদ্ধারা।

অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই কর্মকর্তাকে আটকের জের ধরে "হানিবল নীতি" বাস্তবায়নের এক বিতর্কিত নির্দেশ দেয়া ইসরায়েল। যার ফলে সেনারা সাধারণ মানুষ, গাড়ি ও ঘরবাড়িতে বর্বরোচিত বোমা হামলা চালায়।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একটি তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায়, প্রতিপক্ষদের হাতে আটক থাকার চেয়ে গোল্ডিনের মৃত্যু শ্রেয়- এই বিশ্বাস থেকে নৃশংস এই হামলা চালোনো হয়। এতে শুধু ১ আগস্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাফায় এক হাজারেরও বেশি বোমা, মিসাইল ও গোলাবর্ষণ করা হয়।

প্রতিবেদন বলা হয়, "সংঘর্ষের পর ইসরায়েলি সেনা কমান্ডার ও সৈনিকদের গণমাধ্যমে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়, কি কারণে তারা মানুষজন মেরে ফেলা ও ঘর-বাড়ি, সম্পদ ধ্বংসকারী এই হামলা চালাতে বাধ্য হয়েছিল। প্রতিশোধ নেয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং রাফার মানুষদের শিক্ষা দেয়া বা শাস্তি দেয়ার জন্য তারা এটা করেছিল।"

এই হামলায় আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন এবং অন্যান্য যুদ্ধাপরাধের আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

একটি টানেলে রক্তের চিহ্নের পাশে গোল্ডিনের জিনিসপত্র পাওয়া ও তাকে মৃত্যু ঘোষণার পরও ইসরায়েল বেশ কয়েকদিন ধরে এই হামলা অব্যাহত রাখে।

শেষ পর্যন্ত ১৩৫ জন সাধারণ মানুষ মারা যায়, অসংখ্য আহত হন। আড়াই হাজারেরও বেশি বাড়িঘর সম্পূর্ণরুপে ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এর আগে জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন জানিয়েছিল যে উদ্দেশ্য আইনসিদ্ধ করতে ও সাধারণ নাগরিকদের হতাহতের সংখ্যা কমাতে ইসরায়েলি সেনারা কোনো পূর্ব সতর্ক সঙ্কেত দেয়নি।

গাজার বাসিন্দা আব্দুর রহিম লতিফ বলেছেন, "আমি বাম পায়ে আঘাত পেয়েছিলাম। কাছাকাছি তাকিয়ে আমার ছেলেকে দেখতে পাই। সে আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এক মুহুর্ত পর, দ্বিতীয় রকেট পতিত হল, তখন মৃত ছেলেকে নিয়ে আমি বসেছিলাম। কাছেই রকেটের আঘাতে নীল জামা পড়া এক যুবক উড়ে গেল।"

মেডিক্যাল ছাত্র আব্দুল মুমিন পূর্ব রাফায় সেই নৃশংস হামলার কথা স্মরণ করে বলেন, "এত বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল যে আমরা আহতদের কাছে পৌঁছাতেই পারিনি। লোকজন আমাদের কাছে কাকুতি-মিনতি করেছিল... এক ঘন্টারও বেশি সময় পর, আমরা তাদেরকে কঠিন অবস্থায় পেলাম। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মক অবস্থায় পেলাম। যতটুকু পারলাম আমরা তা নিয়ে আসলাম।"

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র এই প্রতিবেদন সম্পর্কে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। জানিয়েছেন, তিনি এখনও এটি দেখেননি। গত বছর গাজায় ইসরায়েলের হামলা নিয়ে কোনো উত্তর দিতেও রাজি হননি। ওই অঞ্চলের সরকারি কর্মকাণ্ডের সমন্বয়ককে প্রশ্ন করা হলেও তিনি এর দায়ভার সম্পর্কে কথা বলেননি।

জেডআই