রবীন্দ্রনাথ তার ছোটগল্প ‘জীবিত ও মৃত’র একেবারে শেষ লাইনে লিখেছেন-‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল যে সে মরে নাই’। আর ভারতের নাগাল্যান্ডের ধর্ষক শরিফ গণপিটুনিতে মারা যাওয়ার পর জানা গেল সে ধর্ষক নয়। ধর্ষক হিসেবে তাকে জীবিত অবস্থায় যে লাঞ্ছিত করা হয়েছে, যার জন্য তাকে কলঙ্ক নিয়ে মরতে হলো, তা মিথ্যে। জীবন দেওয়ার দু’চার দিন বাদেই অপবাদ মিথ্যে প্রমাণিত হবে তা সে মরেও জানতে পেল কি না তা আধ্যাত্মিক প্রশ্ন, যার সঠিক উত্তর কখনোই মিলবে না। কিন্তু নির্দোষ শরিফের মৃত্যু নাগাল্যান্ডসহ পুরো ভারতের অনেক কিছুকে পরিষ্কার করে গেছে। চিন্তাশীল মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে।
কারাগারের গেট ভেঙে টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করে এনে উগ্র জনতা পিটিয়ে মেরেছে শরিফকে। অবশেষে ‘ধর্ষণ করেননি’ বলে বুধবার নাগাল্যান্ড সরকার ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদন দিলেও সাম্প্রদায়িক মনোভাবের ঘৃণ্য মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। আর সেই সাম্প্রদায়িক মনোভাবের চরম বিস্ফোরণে উড়ে গেল শরিফের জীবন অসময়ে। তার সবচেয়ে বড় ভুল নাগা মেয়েকে ভালবাসা নয়, মুসলমান হওয়া। যদি সে মুসলমান না হয়ে হিন্দু হতো তাহলে হয়তো এই বর্বরোচিত ঘটনা ঘটত না।
একদিকে যখন রাজ্যে রাজ্যে নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে হিন্দুত্ববাদী মনোভাব চরমে উঠেছে, সেখানে সংখ্যালঘু উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে শীর্ষে অবস্থানকারী কোন রাজ্য, তা নিয়ে সরকার তামাশার অবকাশ পাচ্ছে। শুধু তাই-ই নয়, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম স্থান দখল করে ঢেঁকুর তুলেছেন। গত কয়েক বছরে সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের স্কলারশিপ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকার ঋণ এবং সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সংরক্ষণেরও ব্যবস্থা করেছেন বলে গর্ব করেছেন। ফেসবুকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যালঘুদের দেওয়া এই বিশেষ সুবিধার তালিকাও পেশ করেছেন। তিনি জানান, ২০১১ সালের মে মাস থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮২ লাখ সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীকে উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ দেওয়া হয়েছে, যার মোট পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা। এটা সব সময়ের জন্য রেকর্ড। আবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে মেয়াদী ঋণ এবং ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া হয়েছে, যার পরিমাণ ৬০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট অনুসারে এটাও মমতার একটি রেকর্ড।
ক্ষুদ্র রেকর্ড যাই তুলে ধরুক না কেন, সুবিধার কিংবা অসুবিধার। কিন্তু সবার আগে নির্বিশেষে ভারত সরকারের উচিত সর্বত্র তার জনগণের জীবন, ধর্ম ও সম্মান রক্ষার সুবিধাদি নিশ্চিত করা। তা না হলে জায়গায় জায়গায় রেকর্ড ভাল দেখিয়েও সবার দৃষ্টি সেদিকে ফেরানো যাবে না। আপামর জনগণের মন থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা দূর করা না গেলে কিংবা আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে অসমর্থ হলে তা দুঃখজনক অমানবিক পরিবেশের সৃষ্টি করবে।
সূত্র: দ্য রিপোর্ট
জেএ





