বাংলাদেশের চলমান সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সের সেমিনারকক্ষে সিটিজেন মুভমেন্টের উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারে উপস্থিত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপিগণ বলেছেন, বাংলাদেশে অগ্রহণযোগ্য সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে জঙ্গীবাদের উত্থান হচ্ছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে সুষ্ঠু নির্বাচনহীন শূন্যতার কারণে গণতান্ত্রিক ব্যবস্হা ভেঙে পড়েছে । বাংলাদেশে এখনও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি । বাংলাদেশে গণতন্ত্র এবং বাক স্বাধিনতা ‘ধসে পড়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সের সেমিনারকক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে ব্রিটিশ এমপিগণ এইসব কথা বলেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বাংলাদেশ সংক্রান্ত সর্বদলীয় কমিটির সহ-সভাপতি সায়মন ড্যানজুকের পরিচালনায় সেমিনারে বক্তব্য রাখেন, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশ বিষয়ক অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের চেয়ারম্যান অ্যান মেইন এমপি, নিস ডাকিন এমপি, রিচার্ড ফোলার এমপি, পাওয়েল ব্লুমফিল্ড এমপি, জেমস কার্টেইজ এমপি, এ্যান্ডু স্টিভেন এমপি, এ্যান্ডু সিমেন্স এমপি, জিম পেট্রি এমপি, সিটিজেন মুভমেন্টের চেয়ারম্যান এম এ মালিক প্রমূখ। সেমিনারে যুক্তরাজ্য পার্লামেন্টের সংসদ সদস্যরা ছাড়াও যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশী কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও পেশাজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন- ইউকে বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম এ কায়সার, ইন্টারন্যাশনাল ল’ইয়ার্স ভয়েসের সভাপতি ব্যারিস্টার এমএ সালাম, সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান, সাংবাদিক মুহাম্মদ নূরে আলম বরষণ, মানবাধিকার সংগঠক মনিরুল হক, এস এম মাহবুবুর রহমান, সাবেক ছাত্রনেতা পারভেজ মল্লিক, কামাল উদ্দিন, ব্যারিষ্টার শাহজাহান, ব্যারিষ্টার হামিদুল হক লিটন আফিন্দি, সলিসিটর নাসের খান অপু, জাহিদ হাসান গাজী, কামরান মু জাকি বিল্লাহ প্রমুখ। এতে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশী কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও যুক্তরাজ্য পার্লামেন্টের সংসদ সদস্যসহ পেশাজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশ বিষয়ক অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের চেয়ারম্যান অ্যান মেইন এমপি বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে হাউস অব কমন্সে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না। তিনি অভিযোগ করেছেন, যে বাংলাদেশে গণতন্ত্র এবং বাক স্বাধিনতা ‘ধসে পড়েছে।‘
তিনি আরও বলেন, হাউস অব কমন্সে বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠিত সিদ্ধান্ত প্রস্তাবে কনজারভেটিভ, লেবার, লিবারেল ডেমোক্র্যাট সবাই একমত পোষণ করেছে। এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয় এবং শিগগিরই সবার অংশগ্রহণে আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সব দলের সদস্য একমত হয়েছেন।

ব্রিটিশ এমপি সাইমন ডানুজক বলেছেন, ‘বাংলাদেশে যে কোনো সময় গৃহযুদ্ধ বেধে যেতে পারে। বাংলাদেশে সুশীল সমাজ চুপসে যাচ্ছে এবং সুশীল সমাজের জায়গায় স্থান করে নিচ্ছে জঙ্গিরা। ‘অতীতে মধ্যপন্থী মুসলিম দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশে ক্রমেই জঙ্গিরা শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সম্প্রতি ছুরি ও চাপাতির আঘাতে যাদের খুন করা হয়েছে তাদের হত্যার দায় স্বীকার করেছে আইএস জঙ্গি গোষ্ঠী। যদিও বাংলাদেশ সরকার এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিদের সম্পৃক্ততা নাকচ করে দিয়েছে।’
সাইমন ডানজুক বলেন, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশে অগ্রহণযোগ্য সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে জঙ্গীবাদের উত্থান হচ্ছে।
রিচার্ড ফোলার এমপি বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে হলে রাজনীতিবিদদের মধ্যে অবশ্যই সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরস্পরের প্রতি আস্থা নেই। তিনি বলেন, একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত না হলে বিশ্বসম্প্রদায় থেকে বাংলাদেশ ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। সন্ত্রাসী হামলার সঠিক তদন্ত না হওয়ায় দেশে জঙ্গীবাদের উত্থান দেখা দিচ্ছে ।
পাওয়েল ব্লুমফিল্ড এমপি বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি মর্মে এরই মধ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, অবিলম্বে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনায় বসতে হবে।
জেমস কার্টেইজ এমপি বলেন, বাংলাদেশে অবিলম্বে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে একদলীয় সরকার গঠন করা হয়েছে। এটাকে গণতন্ত্র বলা যায় না।
সিটিজেন মুভমেন্টের চেয়ারম্যান এম এ মালিক বলেন, বাংলাদেশে এখন ভারতের উপনিবেশ। ভারত শেখ হাসিনার মাধ্যমে বাংলাদেশে গণহত্যা চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল এখনি শেখ হাসিনার গণবিরোধী সরকারকে হটাতে ব্যর্থ হলে জনগণ নিজেরা যদি মোকাবেলা করে তবে সেটি হবে আরো একটি বিপর্যয়। নিজের অখন্ডতা রক্ষার নামে বাংলাদেশ থেকে ভারতের এই আধিপত্যবাদ বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক মহলকে উদ্যোগ নিতে হবে।
সেমিনারে ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা বলেন, দেশে প্রতিদিন মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে, জনগণের বাক স্বাধীনতা এবং সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা সরকার হরণ করেছে। ৫ জানুয়ারির পর থেকে বাংলাদেশে পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। এটা বর্তমান সরকারেরই একটি পূর্ব পরিকল্পনা। ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন থেকে বিশ্বসম্প্রদায়ের দৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য এই হামলা হচ্ছে। এর সঙ্গে সরকারি দলের লোকরাই জড়িত। বিভিন্ন জায়গায় হামলা করার সময় সরকারি দলের লোকরা ধরা পড়েছে। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের প্রক্রিয়া চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মূলত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিচার হচ্ছে। এই বিচার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে হয়নি বলে এরই মধ্যে বিশ্বসম্প্রদায় উদ্বেগ জানিয়েছে।
মুফতি শাহ সদর উদ্দিন বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক ভুল করেছিলেন বলেই তার পতন হয়েছিল। তার মেয়েও বাবার অনুসরণে একই ভুল পথে হাঁটছেন। অবৈধ অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও পতন হবে।
জাস্ট নিউজের সম্পাদক বিশিষ্ট সাংবাদিক মুসফিকুল ফয়সাল আনসারী বলেন, বাংলাদেশে এখন এক ব্যক্তির শাসনের মাধ্যমে ভারতীয় আধিপত্যবাদ কায়েম হয়েছে। এ নির্বাচনের মাধ্যম প্রমাণ হয়েছে—শেখ হাসিনা নয়, বাংলাদেশ শাসন করছে এখন ভারত। অবিলম্বে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করে গঠিত অবৈধ একটি সরকার এখন একদলীয় শাসন কায়েম করছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর উচিত হবে গণতন্ত্রের নামে এই একদলীয় শাসনকে স্বীকৃতি না দিয়ে অবিলম্বে নির্বাচনের জন্য চাপ সৃষ্টি করা।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, সরকার ভিন্নমতকে পুরোপুরি দমন করেছে। এরই মধ্যে দৈনিক আমার দেশ, চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামিক টেলিভিশন এবং এক সময় বর্তমান সরকারি দলের সমর্থক ছিল, হালে ভিন্নমত পোষণকারী পত্রিকাও রেহাই পায়নি। এরই ধারাবাহিকতায় বন্ধ করা হচ্ছে মিডিয়া ।
তিনি আরও বলেন, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডের নামে পুলিশ হেফাজতে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। এখনও কারাগারে তাকে নানা নির্যাতন সহ্য করতে হচ্ছে। সাংবাদিক শফিক রেহমান দীর্ঘদিন ধরে জেলে বন্দি ।
এসএম/কেবি





