রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জোর করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী।
চলমান রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে বৃহস্পতিবার (১৫ নভেম্বর) কূটনীতিকদের অবহিত করার পর সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মন্ত্রী এই কথা বলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফেরত যেতে জোর করছে বলে একটি নেতিবাচক প্রচারণা রয়েছে। বাংলাদেশ কেন তাদের দেশ ছাড়তে জোর করবে? এই দেশই তো তাদের আশ্রয় দিয়েছে। তাদের জোর করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নই আসে না।”
মন্ত্রী জানান, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য রোহিঙ্গা শিবিরের প্রধানদের ইউএনএইচসিআরের সহায়তায় সেখানে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে জাপান এবং সরকার এই বিষয়ে কাজ করছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ‘মুলতবি’করা হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে অস্বীকার করায় আজ এটা হয়নি, কিন্তু তা পরে হতে পারে।
তবে প্রত্যাবাসন কবে শুরু হতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেননি।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া সত্ত্বেও বৃহস্পতিবার (১৫ নভেম্বর) পূর্বনির্ধারিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হয়নি। কারণ রোহিঙ্গারা নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে ইচ্ছুক নয়।
এর আগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, “রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিত করা হয়েছে, কারণ তারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায় না।”
আবুল কালাম আরও বলেন, “আমরা তাদের সিদ্ধান্ত নিতে দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সময় দিয়েছিলাম এবং অপেক্ষা করেছি, কিন্তু কেউ ফিরে যেতে রাজি হয়নি। রোহিঙ্গারা যখন রাজি হবে তখন এই প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হবে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ১৫০ জন রোহিঙ্গাকে বৃহস্পতিবার (১৫ নভেম্বর) বিকেলে প্রত্যাবাসন করতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু তার আগেই বিভিন্ন শিবিরের রোহিঙ্গারা বিক্ষোভ শুরু করে এবং নিজ দেশে ফিরে যেতে অনিচ্ছার কথা জানায়।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একমত হয়েছিল যে ১৫ নভেম্বর থেকে রোহিঙ্গাদের প্রথম ব্যাচের প্রত্যাবাসন শুরু করা হবে এবং ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন ১৫০ জনকে ফেরত পাঠানো হবে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২ হাজার ২৬০ জন রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বছরের পর বছর ধরে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর মিয়ানমারের নৃশংসতার কারণে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সর্বশেষ গত বছর ২৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর নৃশংসতার পর কমপক্ষে ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্র-বৌদ্ধরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর গণহত্যা-ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মত ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়ে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা ঘরবাড়ি ফেলে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। নতুন এবং পুরাতন মিলিয়ে ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এখন প্রায় ১১ লাখ।
এর আগে বিভিন্ন সময় সেনাবাহিনী ও উগ্র-বৌদ্ধদের নির্যাতনে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়ে আছে ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এর অনুসন্ধানে গণহত্যারপ্রমানও মিলেছে। তাঁরাবলছে, বর্মী সৈন্যরা গ্রামবাসীদের সাথে নিয়ে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলীয় ইন দিন গ্রামে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর গণহত্যার ঘটনা ঘটেছিলো। এই গ্রামে ১০ জন রোহিঙ্গাকে হত্যার বিষয়ে তাদের দুই সাংবাদিক ওয়া লো এবং চ সো উ-কে সেখানে তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে বলা হয়, ওই গ্রামে অভিযানের সময় রোহিঙ্গা পুরুষদের একটি দল নিজেদের জীবন বাঁচাতে একটি জায়গায় গিয়ে জড়ো হয়। তখন ওই গ্রামের কয়েকজন বৌদ্ধ পুরুষ একটি কবর খনন করার নির্দেশ দেন। তারপর ওই ১০ জন রোহিঙ্গা পুরুষকে হত্যা করা হয়। বৌদ্ধ গ্রামবাসীরা অন্তত দু’জনকে কুপিয়ে এবং বাকিদেরকে সেনাবাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে।
এমবি





