বিয়ে না করা এবং সন্তান না নেবার প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা ইদানীং বেশি ঝুঁকছেন। এমনকি পুরুষদের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর ক্ষেত্রেও সেখানকার নারীদের অনীহা রয়েছে।

পৃথিবীতে সবচেয়ে কম জন্মহার যেসব দেশে তার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া অন্যতম। বর্তমান অবস্থার কোন পরিবর্তন না হলে দেশটিতে জনসংখ্যা কমার দিকে যাবে।

" আমি কখনোই সন্তান নেব না। আমার সে পরিকল্পনা নেই," বলছিলেন ২৪ বছর বয়সী জ্যাং ইয়ান-ওয়া। সন্তান নেবার জন্য যে শারীরিক ধকল সইতে হয় সেজন্য প্রস্তুত নন তিনি। সন্তান জন্ম দিলে পেশাগত ক্ষতি হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

ব্যাপক এক সমস্যায় পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির নারীরা দিন দিন বিয়ে ও মাতৃত্বের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। শুধু নাই নয়, বিয়ে না করতে তারা একটি আন্দোলনও শুরু করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০১০ সালে যেখানে দেশটির ৬৪.৭ শতাংশ নারী মনে করতেন বিয়ে তাদের জন্য জরুরি; সেখানে ২০১৮ সালে এসে ৪৮.১ শতাংশ নারী জানায়, তারা বিয়েকে জরুরি মনে করেন না।

আর এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরীয় নারীদের বিয়ের প্রতি অনীহা দেশটির সরকারকে সত্যিই চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। কেননা বিশ্ব ব্যাংকের এক তথ্যানুযায়ী উন্নত দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় জন্মহার সবচেয়ে কম।

মুন-জেয়ং গর্ভবতী হবার বিষয়টি তাঁর অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানালেন, তখন খুব বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আচরণে তিনি রীতিমতো বিস্মিত হন।

"আমার বস বললেন, আপনার সন্তান হলে সেটিই হবে আপনার মনোযোগের জায়গা। তখন কর্মস্থলকে আপনি কম গুরুত্ব দেবেন। তখন আপনি কাজ করতে পারবেন?" বলছিলেন চোই মুন-জেয়ং।

সে সময় তিনি একজন ট্যাক্স অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাঁর উপর কাজের বোঝা চাপাতে থাকেন এবং অভিযোগ করেন যে কাজের প্রতি মুন-জেয়ং-এর কোন মনোযোগ নেই।

মানসিক চাপ সইতে না পেরে একদিন অফিসেই অজ্ঞান হয়ে যান তিনি। মুন-জেয়ং যাতে চাকরি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় সে পরিস্থিতি তৈরি করেন তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

" আমার আশপাশে অনেকেই আছেন যাদের কোন সন্তান নেই এবং সন্তান নেবার কোন পরিকল্পনাও তাদের নেই," বলছিলেন মুন-জেয়ং।

বিয়ের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে যেসব সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়েছে তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে সোলো-ডারিটি। দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ইউটিউব স্টার বায়েক হা-না ইউটিউবে এই ‘সোলো-ডারিটি’ চ্যানেলটি পরিচালনা করেন।

পেশায় অ্যাকাউন্ট্যান্ট বায়েক বলেন, আমার বয়স ৩০-র কোঠায় হওয়া সত্ত্বেও আমি অবিবাহিত থাকায় বা মা না হওয়ায় সমাজের মনোভাব এমন যে আমি ব্যর্থ। নিজেকে কারও ভাবার চেয়ে, এখন আমি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও উচ্চাকাক্ষী হতে পারি।

বায়েক কিন্তু তার চ্যানেলে বেশ সাড়াও পাচ্ছেন। মাত্র পাঁচ মাসে তার চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ২৩ হাজার।

আরও একটি গ্রুপ আছে যারা বিয়ে না করার ব্যাপারে দক্ষিণ কোরিয়ার নারীদের উৎসাহ দিয়ে থাকে। ওই গ্রুপের নাম হচ্ছে- ‘এলিট উইদাউট ম্যারেজ, অ্যাম গোয়িং ফরওয়ার্ড’। এই গ্রুপের সদস্যরা নিজেদের ‘বি-হোন’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। যারা বিয়ে করেননি তাদের দক্ষিণ কোরিয়ায় ‘বি-হোন’ বলা হয়।

তাছাড়া ছেলে বন্ধু কিংবা স্বামীদের দ্বারা শারীরিকভাবে নির্যাতনের আশংকাও রয়েছে। এতে থেকে বোঝা যাচ্ছে যে দক্ষিণ কোরিয়ায় কেন জন্মহার কম। দেশটিতে বিবাহের হার এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে আছে।

প্রতি হাজারে ৫.৫ শতাংশ। ১৯৭০ সালে এ হার ছিল ৯.২ শতাংশ। বিয়ে কিংবা সন্তান নিতে অনাগ্রহের আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে জীবনযাত্রার ব্যয়।

এসব নানা কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার সমাজ ব্যবস্থায় একটি বড় ধরণের পরিবর্তন ঘটছে। এর ফলে দেশটিতে তৈরি হয়েছে 'সাম্পা প্রজন্ম'।

'সাম্পা' শব্দের অর্থ হচ্ছে তিনটি জিনিস বাদ দাও - সম্পর্ক, বিয়ে এবং সন্তান।

এএস