১৯৮৮ সালে তৈমুরকে তার মা, বোন এবং আরও অনেকের সাথে একটি গর্তে ফেলে গুলি করেছিল সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী। কিন্তু তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনই এক ভয়াবহ অনুভূতির কথা জানিয়েছেন তিনি।
তৈমুর আবদুল্লা আহমেদ ১৯৮৮ সালের মে মাসে সেই দিনের কথা প্রায় প্রতিটি দিন মনে করেন, সে সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। তিনি বলেন, আমি দেখলাম আমার চোখের সামনে মা'কে মেরে ফেলা হচ্ছে। আমার কোনও শক্তি ছিল না। আমি তাকে রক্ষা করতে পারিনি। এরপরে আমি দেখলাম আমার দুটি বোনকে মেরে ফেলা হচ্ছে। শুধু আমার মা আর বোনেরা নয়, তারা আমার সব আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করেছিল।
তাদের অপরাধ এটাই ছিল যে - তারা সাদ্দাম হোসেনের ইরাকে কুর্দি পরিচয়ের মানুষ। তখন তিনি প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন - তবে সেই ফেরা হয়েছে শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে নয়। তিনি বিবিসিকে বলেন, আমি ওইদিনই আসলে মারা গিয়েছিলাম। সেই কবরস্থানে আমার মা ও বোনদের সাথে আমার হৃদয়ের মৃত্যু হয়েছিল।
তবে তিনি যে পুরোপুরি অক্ষত ছিলেন তা নয়। বাহুতে ও পিঠে গুলি লেগেছিল তার। কিন্তু তারপরেও তিনি অন্ধকারের মধ্যে গর্ত থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হতে পেরেছিলেন এবং এ কারণেই তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। ওই নৃশংসতার স্মৃতি আহমেদের মনে এখনও খুব স্পষ্টভাবে গেঁথে আছে এবং সেদিনের পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষ বর্ণনা দিতে পিছপা হন না।
"আমি দেখলাম একটি গুলি আমার মায়ের মাথায় আঘাত করল এবং এর প্রভাবে তার স্কার্ফ খুলে গেল। আরেকটা বুলেট আমার বোনের গালের ভেতরে ঢুকে তার মাথা থেকে বেরিয়ে যায়।" "আমার অন্য বোনের বাহুতে গুলি করা হয়েছিল এবং রক্ত পানির মতো প্রবাহিত হচ্ছিল," তিনি বলেন।
যখন তৈমুর ঘুমাতে যান বা কোনও শিশু বা তরুণ বয়সী মেয়েদের দেখেন, তখন এই দৃশ্যগুলো বারবার তার মনে ফ্ল্যাশব্যাক হয় এবং তিনি চিন্তা করতে থাকেন যে তার পরিবারের সাথে কী হয়েছিল। "আমি আর কখনও একজন সাধারণ মানুষের মতো বাঁচতে পারব না," তিনি বলেন, "যতবার আমি এসব নিয়ে ভাবি, আমি মরে যাই।"
তৈমুরের এখন বয়স ৪৩ বছর। বিবিসিকে তিনি জানান তাঁর বেঁচে থাকা এবং ন্যায়বিচারের দাবির এক অসাধারণ গল্প। জুনে, ইরাকি কর্তৃপক্ষ সেই জায়গাটি খনন করতে শুরু করে যেখানে আহমেদ বিশ্বাস করেন যে তার পরিবারের মানুষদের মাটিচাপা দেয়া হয়েছে।
কিন্তু তারা এই খোঁড়াখুঁড়ির বিষয়ে তৈমুরকে কিছু জানাননি। তারা কুর্দি অঞ্চলে লাশগুলো পুনরায় দাফনের পরিকল্পনা করছে। এতে তৈমুর ভীষণ রেগে যান - তিনি জানান যে এমন গোপনীয়ভাবে দেহাবশেষগুলো স্থানান্তরিত করার কোন অর্থ নেই।
"আমি চাই সমগ্র বিশ্ব আমাদের লোকদের সাথে কী ঘটেছিল তা দেখুক। আমি চাই যে গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগ মুহূর্তে যে নিরীহ শিশুটি মা'কে আঁকড়ে ধরে ছিল, তাদের মৃতদেহ ক্যামেরা জুম করে দেখাক।" তিনি মনে করেন যে এই গণহত্যার বর্বরতা সম্পর্কে খুব কম মানুষ অবগত আছে এবং তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে কাউকে প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখেননি।
আহমদ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, কিন্তু বন্ধুরা যখন তাকে খবর দেন যে ওই গণকবরটি খোঁড়াখুঁড়ি করা হবে তখন তিনি দ্রুত ইরাকে ফিরে আসেন। তিনি এখন গণকবরটি তোলা রোধে লড়াই করছেন যেখানে তাঁর মা, বোন এবং নিকটাত্মীয়দের দেহাবশেষ রয়েছে। তথ্যসূত্র : বিবিসি বাংলা।
এবিসিদ্দিক





