রোহিঙ্গা ইস্যুতে ব্রিটিশ এমপিদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। উল্টো ‘একচোখা অভিযোগ’ তোলার দায়ে ব্রিটিশ এমপিদেরই দুষছে তারা। রাখাইন রাজ্যে কোনও ধরনের সহিংসতা, বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে নিজেদের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে সেনাবাহিনী। তাদের দাবি, রোহিঙ্গারাই নিজেদের ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যায়।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাখাইনের সহিংসতার ঘটনায় তদন্তকাজ পরিচালনা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কোনও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা যৌন সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত নয়। বেআইনিভাবে কাউকে আটক, মারধর, হত্যাকাণ্ড ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেনি। বরং আরসা সমর্থক ‘উগ্রপন্থী বাঙালি সন্ত্রাসীরা’ নিজেদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। হুমকি দিয়ে অন্য গ্রামবাসীদেরও তারা বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে। এর ফলশ্রুতিতে অনেকেই পালিয়ে যান।
এর আগে গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ নিয়ে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসনের কাছে একটি চিঠি লেখেন দেশটির এমপিরা। ১০২ জন জন ব্রিটিশ এমপির পক্ষে চিঠিটি লিখেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি রুশনারা আলী। টুইটারে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়াবহ নৃশংসতাকে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। চিঠিতে রোহিঙ্গা নিধনের মূল হোতা মিয়ানমারের সেনাপ্রধানকে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) বিচারের উদ্যোগ নিতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
ব্রিটিশ এমপিরা বলেন, নিরাপত্তা পরিষদে এ বিষয়ে প্রস্তাব তুললে চীন ও রাশিয়া বিরোধিতা করবে। ফলে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য তৈরি করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এ প্রক্রিয়া শুরু হওয়া উচিত।
চিঠিতে বলা হয়, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্ত্র সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বন্ধের বিষয়টি ব্রিটিশ সরকারের নিশ্চিত করা উচিত। জাতিসংঘের মাধ্যমেও মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নিতেও বরিস জনসনের প্রতি আহ্বান জানান এমপিরা।
ওই চিঠির প্রেক্ষিতেই এই বিবৃতি দিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের ঘটনায় নিজেদের বিরুদ্ধে আনা সব দায় অস্বীকার করেছে এ বাহিনী।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নতুন করে জাতিগত নিধনযজ্ঞ শুরু হলে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের হাতে খুন হন সহস্রাধিক রোহিঙ্গা। পুড়িয়ে দেওয়া হয় গ্রামের পর গ্রাম। ভয়াবহ যৌন সন্ত্রাসের শিকার হন রোহিঙ্গা নারীরা। ওই ঘটনাকে গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করে জাতিসংঘ।
ব্রিটিশ এমপিদের বক্তব্য অস্বীকার করে সহিংসতার জন্য ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের’ দায়ী করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। উল্টো স্থানীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী রোহিঙ্গা সংগঠন আরসা গণহত্যা ও জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালিয়েছে বলে অভিযোগ বর্মি সেনাদের।
এদিকে রোহিঙ্গাদের বিপন্নতার মধ্যে রাখাইন পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে মিয়ানমার সফরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কমিটি। সফরে দেশটির ডি ফ্যাক্টো সরকারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি’সহ ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের বৈঠকের কথা ছিল। রোহিঙ্গা ইস্যু ছাড়াও মিয়ানমারে ব্রিটিশ সরকারের সহায়তা প্রকল্পের সুরক্ষা নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী ছিলেন যুক্তরাজ্যের এমপিরা। তবে ১ মার্চ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের খবরে জানা যায়, রাখাইনে ব্রিটিশ এমপিদের ঢুকতে দেবে না মিয়ানমার। ফলে তাদের সফরের অনুমতি মেলেনি।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি কমিটির চেয়ার ও লেবার পার্টির এমপি স্টিফেন টুইগ জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যের বার্মিজ দূতাবাস তাদের ভিসা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা খুবই হতাশ। আমরা কি করে অবিশ্বাস করি, এই ঘটনা রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের প্রতিবেদনের প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া নয়? এই কারণেই নেপিদোতে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চিসহ সেদেশের মন্ত্রী ও সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকগুলো বাতিল করতে হয়েছে।’
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের ঘটনায় বার্মিজ কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল একই প্রতিনিধিদল। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর দমন-পীড়নের সময় যৌন সহিংসতার প্রামাণ্য দলিল তুলে ধরেছিলেন ব্রিটিশ এমপিরা। জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এই কমিটি। ব্রিটিশ এমপিরা বলছেন, মিয়ানমারের কর্মকাণ্ডে ‘মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়’ তৈরি হয়েছে। আর তা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে ব্রিটিশ এমপিদের প্রতি ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।
এসএম





