ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘মে বাংলাদেশকা আপন লাগতাহায়’ অর্থাৎ বাংলাদেশকে আমার আপন লাগে। ১৮তম সার্ক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে বুধবার বিকেলে দ্বিপক্ষীয় বৈঠককালে নরেন্দ্র মোদী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে এমন কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহার চৌধুরী বুধবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। নেপালের রাজধানী কাঠমন্ডুর হোটেল রেডিসনের সার্ক মিডিয়া সেন্টারে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকনও উপস্থিত ছিলেন।

ইকবাল সোবহান বলেন, বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী তিস্তা চুক্তিসহ অভিন্ন নদীর পানি বন্টনে বাংলাদেশের সাথে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

বাংলাদেশ ভারতের অভিন্ন সীমানা নিয়ে চলমান সমস্যা সমাধানে ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা মুজিব চুক্তির বাস্তবায়নে ভারতে জনমত তৈরি হয়েছে এমন তথ্য দিয়ে মোদি বলেন, সীমান্ত সমস্যারও সমাধান খুব শিগগিরই হয়ে যাবে।

বৈঠকে উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রী জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদকে এই অঞ্চলের উন্নতির পথে প্রধান বাধা হিসেবে আখ্যায়িত করে এ ব্যাপারে তথ্য আদান-প্রদানে একমত হয়েছেন বলেও সংবাদ সম্মেলন জানিয়েছেন ইকবাল।

প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরে আসার আমন্ত্রন জানালে মোদী বলেন খুব শিগগিরই তিনি বাংলাদেশ সফরে আসবেন এবং এ ব্যাপারে তার দেশের প্রস্তুতি চলছে।

বৈঠকে জাতিসংঘে ভবিষ্যতে ভারত যেন আরো জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে সেজন্য বাংলাদেশের সহযোগিতা কামনা করেন মোদি।

নওয়াজের স্ত্রী-সন্তান হাসিনার ভক্ত

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ বলেছেন, তার স্ত্রী এবং কন্যা শেখ হাসিনার ভক্ত। বুধবার সন্ধ্যায় কাঠমন্ডুর হোটেল সল্টিতে শেখ হাসিনার সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের সময় নওয়াজ শরীফ এমন কথা বলেছেন।

বুধবার রাতের সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্যও জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী।

বিষয়টির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নওয়াজ শরীফকে উদ্ধৃত করে সোবহান বলেন, কোন এক ওমরা হজ্জ পালনকালে নওয়াজ শরীফের স্ত্রী ও কন্যাকে শেখ শেখ হাসিনা অনেক সহায়তা করেছিলেন এবং তাদের প্রতি সৌজন্যতা দেখিয়েছিলেন।

শামরিক শাসনের সময় জেলে থাকাকালে তার পরিবারের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সহমর্মিতা জানানোর জন্য শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান নওয়াজ শরীফ।

এছাড়া বৈঠকে পাকিস্তানের ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং সেনাশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের জন্য নওয়াজ শরীফকে অভিনন্দন জানান শেখ হাসিনা।

অপরদিকে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বাগত জানান।

বৈঠকে অত্র অঞ্চলের সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় বাংলাদেশের সাথে একযোগে কাজ করার আগ্রহ জানিয়ে নওয়াজ শরীফ বলেন, তার দেশে সন্ত্রাসবাদ সমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়েছে।

পাকিস্তানে প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না এমন তথ্য দিয়ে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ চাইলে প্রধানমন্ত্রী ২০০৬ সালে মাত্র ৩০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ থেকে বর্তমান সরকার কিভাবে প্রায় ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে তা নওয়াজ শরীফকে অবহিত করেন।

প্রধানমন্ত্রীর কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নওয়াজ শরীফ বলেন, শিগগিরই পাকিস্তানের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে যাবে এবং বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে সৌর বিদুৎ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাপকভাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে।

সবশেষ উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশে গণতন্ত্রের কোন বিকল্প নেই এমন অভিমত ব্যক্ত করে গণতন্ত্র রক্ষায় একযোগে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী ৭১-এ বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ করেছে

নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশে ছিলেন এবং বাংলাদেশের পক্ষে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

বুধবার বিকেলে কৈরালা শেখ হাসিনার সাথে সৌজন্য সাক্ষাতকালে এ তথ্য জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।

কৈরালা শেখ হাসিনাকে বলেন, ১৯৭১-এ তিনি যখন যুবক ছিলেন তখন বাংলাদেশের পক্ষে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন এবং যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন।

শেখ হাসিনা এ সময় কৈরালার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দানকারী ৭ম দেশ হিসেবে অভিনন্দন জানান।

শেখ হাসিনা কৈরালাকে আরও বলেন, নেপাল এবং ভুটান যাতে ভারতের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট সুবিধা পায় এবং বাংলাদেশে সরাসরি বাণিজ্য বৃদ্ধি করতে পারে সেজন্য ভারতকে অনুরোধ জানাবেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কৈরালাকে আরও বলেন, মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমা বিরোধের সমাধান হওয়ায় এ অঞ্চলের বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে।

নেপাল ও ভুটানের পানি ও পাহাড়ের ঝর্ণাকে একটি বড় সম্পদ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা এটাকে কাজে লাগিয়ে হাইড্রোলিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে নজর দিতে কৈরালার প্রতি আহবান জানান।

প্রোটোকল ভেঙ্গে আফগান রাষ্ট্রপতির সাক্ষাত

আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি দেশটির সরকার প্রধান হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্র প্রধানও। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি প্রোটোকল উপেক্ষা করে নিজে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করেছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী।

সংবাদ সম্মেলনে ইকবাল সোবহান চৌধুরী আরও বলেন, শেখ হাসিনার সাথে সৌজন্য সাক্ষাতকালে আফগান প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

যমুনা বহুমুখী সেতু এবং পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু সেতু নামে বাংলাদেশের বৃহত সেতুর কাজ হওয়ার সময় বিশেষজ্ঞ টিমের সাথে আশরাফ ঘানি বাংলাদেশে এসেছিলেন বলেও তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানান।

সরকার প্রধান হিসেবে সার্কের অধিবেশনে সবচেয়ে বেশি যোগদান করার জন্য শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানান আফগান প্রেসিডেন্ট।

তিন দশকেও সার্ক কেন আশানুরুপ কোন অবস্থানে যেতে পারেনি, সেব্যাপারে সবচেয়ে অভিজ্ঞ হিসেবে সব দেশের সরকার প্রধানদের পরামর্শ দেয়ার জন্য শেখ হাসিনার প্রতি আহবান জানান আফগান প্রেসিডেন্ট।

 

কাঠমন্ডুর মিডিয়া সেন্টার থেকে