দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ-ইস্ট এশিয়ান ন্যাশনসের (আসিয়ান) বার্ষিক সম্মেলন শুরু হয়েছে সংস্থাটির অন্যতম সদস্য মিয়ানমারের উপস্থিতি ছাড়াই। গতকাল মঙ্গলবার থেকে সংস্থাটির ভার্চুয়ালি এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর আগে গত ১৫ অক্টোবর আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত সম্মতিতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ না জানানোর সিদ্ধান্ত নেয় সংস্থাটি।
দেশের ভেতরে সৃষ্ট সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক জান্তার সামনে একটি আঞ্চলিক শান্তিচুক্তি উপস্থাপন করেছিল আসিয়ান। তা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছিল। জান্তা সরকার তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল; কিন্তু তারা ব্যর্থ হওয়ার কারণে আসিয়ান নেতারা ওই সরকারকে তাদের সম্মেলন থেকে বাদ রেখেছে। এটা সামরিক জান্তা মিন অং হ্লাইংয়ের জন্য সবচেয়ে প্রচণ্ড চপেটাঘাত।
আসিয়ানের বৈঠকে চীন, রাশিয়া-সহ অন্য বিশ্বনেতাদের পাশাপাশি বক্তব্য রাখার কথা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের। ১ ফেব্রুয়ারি বেসামরিক সরকারের প্রধান অং সান সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করে সিংহাসনে বসেন সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং। তখন থেকেই এর প্রতিবাদে রাস্তায় নামে দেশটির খেটে খাওয়া মানুষ, পেশাদাররা। কিন্তু নির্বিচারে তাদের বিরুদ্ধে গুলি চালায় সেনারা। এতে এ পর্যন্ত কমপক্ষে এক হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের সাথে বৈঠকে বসে সমস্যা সমাধানের জন্য জান্তা সরকারকে বলেছিল আসিয়ান; কিন্তু তারা তাতে রাজি হলেও, বাস্তবায়ন করেনি।
ফলে গত ১৫ অক্টোবর আসিয়ান নেতারা বিরল এক সিদ্ধান্ত নেন। তারা বার্ষিক এই সম্মেলন থেকে সেনাপ্রধান ও সামরিক জান্তা সরকারের প্রতিনিধিদের বাদ রাখার সিদ্ধান্ত নেন। জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে এত বড় ও জোরালো পদক্ষেপ এর আগে কাউকে নিতে দেখা যায়নি। উপরন্তু আসিয়ানের মূলতন্ত্রই হলো একে অন্যের দেশের ভেতরকার বিষয়ে নাক গলাবে না এবং তার সাথে যুক্ত হবে না। কিন্তু দৃশ্যত মানবতার জন্যই তাই করেছে আসিয়ান। ফলে একে বিরল ও অত্যন্ত জোরালো এক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আসিয়ানের সদস্য হলো ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম।
এ দিকে রয়টার্স জানিয়েছে, মিয়ানমারের সামরিক শাসন বিরোধী জাতীয় ঐক্য সরকারের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সলেভান। সোমবার অনলাইনে এ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় বলে ওই দিন রাতে জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ।
এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, জাতীয় ঐক্য সরকারের প্রতিনিধি দুয়া লাশি লা ও জিন মার অংয়ের সাথে বৈঠক করেছেন সলেভান। বৈঠকে তাদের সাথে সলেভান মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে গণতন্ত্রের পথে দেশটিকে ফেরানোর চলমান উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেন। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সলেভান বলেন, ‘অভ্যুত্থানের জন্য জবাবদিহিতার প্রতি সক্রিয় সমর্থন দিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র’।’
চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারির সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে প্রতিবাদ বিক্ষোভ ও অস্থিরতায় পঙ্গু হয়ে আছে মিয়ানমার। বেসামরিক প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে দেশটির সামরিক বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করছে ও নৃশংসতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশটির জান্তা সরকার দেশব্যাপী অস্থিরতার জন্য বিরোধী দলগুলোর ছায়া সরকারের মিত্র ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করেছে।
সোমবার জাতিসঙ্ঘের মিয়ানমার-বিষয়ক বিদায়ী দূত বলেছেন, মিয়ানমারের জান্তাকে দেশটির সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও বাড়তে থাকা সহিংসতার অবসান হবে না। সম্প্রতি মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকারী কো জিমিকে গ্রেফতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সলেভান। তার মুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র চাপ অব্যাহত রাখবে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। সলেভান ও ঐক্য সরকারের কর্মকর্তারা মিয়ানমারে কোভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতি এবং দেশটির জনগণকে সরাসরি মানবিক ত্রাণ সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা করেছেন।
মিয়ানমারে বিরোধীরা গঠন করেছে সমান্তরাল সরকার। এর নাম দেয়া হয়েছে ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি)। তারা আসিয়ান এবং আন্তর্জাতিক মহল থেকে স্বীকৃতি দাবি করেছে; কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা কোনো স্বীকৃতি পায়নি। এরই মধ্যে ২৫ অক্টোবর এনইউজির দু’জন প্রতিনিধির সাথে ভার্চুয়ালি সাক্ষাৎ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সলেভান। সোমবার এ ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জেইক সলেভান বলেছেন, মিয়ানমারে গণতন্ত্রপন্থীদের আন্দোলনে অব্যাহতভাবে সমর্থন দিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। এ সময় তিনি সেখানে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার চলমান উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেন। সামরিক বাহিনীর নৃশংস সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন সলেভান। তিান বলেন, অভ্যুত্থানের কারণে অব্যাহতভাবে জবাবদিহিতা চাইবে যুক্তরাষ্ট্র।
এবিএস





