মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাথিস বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে গেলে ইরানের বর্তমান ইসলামী শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা জরুরি।

তিনি একটি দৈনিককে দেয়া সাক্ষাতকারে আরো বলেছেন, তার ভাষায় "ইরানে যেহেতু গণতন্ত্র নেই তাই যে কোনো জটিল বিষয়ে ওই দেশটির সঙ্গে আলোচনা কিংবা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অর্থহীন।" তিনি বলেন, "তেলআবিব থেকে কায়রো পর্যন্ত সবাই তাকে এটা বলেছেন যে, এ অঞ্চলে সংকটের অন্যতম কারণ ইরান এবং স্থিতিশীলতা বিনষ্টে দেশটি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে।"

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের শুরু থেকেই ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে শত্রুতামূলক আচরণ করে আসছে এবং আমেরিকার প্রতি ইরানরে জনগণের ঘৃণা ও অবিশ্বাস ছাড়া আর কিছুই জন্মায়নি। আমেরিকা সবসময়ই ইরানের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে এসেছে এবং তাদের একমাত্র লক্ষ্য যে কোনো মূল্যে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অবৈধ স্বার্থ হাসিল করা। আমেরিকা কেবল ওই দেশকেই গণতান্ত্রিক বলে মনে করে কিংবা শত্রু মনে করে না যারা মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে।

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের আগে ইসরাইলের পর ইরান ছিল আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ। সে সময় ইরান ও সৌদি আরবের রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ওপর ভর করে আমেরিকা এ অঞ্চলে ভারসাম্যমূলক নীতি বজায় রাখত এবং দখলদার ইসরাইলের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। কিন্তু ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর দেশটির জনগণ আমেরিকাসহ অন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং স্বাধীনচেতা নীতি গ্রহণ করে।

এর ফলে ইরানের ব্যাপারে আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। জনগণের রায়ের ওপর ভিত্তি করে ইরানে ইসলামী সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলেও আমেরিকার দৃষ্টিতে ইরান একটি অগণতান্ত্রিক দেশ। এরপর থেকে আমেরিকা যে কোনো উপায়ে ইরানের ইসলামী শাসন ব্যবস্থা উৎখাতের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে আসছে।

বিপ্লব বিজয়ের পর তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ইরান বিরোধী ষড়যন্ত্রের আখড়ায় পরিণত হয় এবং সেখান থেকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার উৎখাতের চেষ্টা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া, তাবাস মরুভূমিতে কমান্ডো বাহিনী পাঠানো, ইরানের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে সাদ্দামকে সর্বাত্মক সাহায্য সমর্থন, কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে ইরান বিরোধী জোট গঠন এসবই আমেরিকার ইরান বিরোধী কর্মকাণ্ডের দৃষ্টান্ত।

বলা যায়, গণতন্ত্র কিংবা মানবাধিকার ইস্যুটি বাহানা মাত্র এবং ইরানের সঙ্গে আমেরিকার শত্রুতার পেছনে ভিন্ন কারণ রয়েছে। বার্তা-সংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেস কিছুদিন আগে সিআইএ'র প্রধানের উদ্ধৃতি দিয়ে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সমস্যার কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

এতে বলা হয়েছে, সিআইএ'র প্রধান মাইক পম্পেও এমএসএনবিসি টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন, "আমরা সবাই লক্ষ্য করছি মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে এবং অতীতের বছরগুলোর তুলনায় এ প্রভাব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এ অঞ্চলের সর্বত্র ইরানের উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে।" সিআইএ'র প্রধান এও দাবি করেন, ইরান আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বে আমেরিকার যাবতীয় হিসেব নিকেশ পাল্টে যায়। আর তখন থেকেই তারা ইরানকে হুমকি বলে প্রচার চালিয়ে আসছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, ইসলামী ইরান এ অঞ্চলে মার্কিন হস্তক্ষেপকামী নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে এবং দেশটি এখন অন্য মুক্তিকামী জাতিগুলোর আদর্শে পরিণত হয়েছে।

ইরানের এ আপোষহীন তৎপরতার ফলে একদিকে ফিলিস্তিনসহ অন্যান্য নির্যাতিত জাতিগুলো আশাবাদী হয়ে উঠেছে অন্যদিকে ইসরাইল ও আমেরিকা তাদের অবৈধ স্বার্থকে বিপন্ন দেখতে পাচ্ছে। বিপ্লব বিজয়ের পর গত চার দশক ধরে ইরান তার অবস্থানে অটল রয়েছে এবং দেশটির অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে।

এমবি