রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, এমন সময় কেউ একজন স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলে উঠল—‘রাষ্ট্রপতি তো ছাগল চরাতে গেছেন’। কিংবা শুনলেন, ‘জিনিসপত্র কিনতে প্রধানমন্ত্রী শহরে গেছেন, এখন তাঁকে পাওয়া যাবে না’। কী মনে হবে আপনার!

বিস্ময়ে ঘোর লাগার কথা! রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে এ ধরনের কথা তো কখনই শোনা যায় না! তবে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য রাজস্থানের রামনগর গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে এটা কিন্তু স্বাভাবিক ব্যাপার। কারণ গ্রামটির মানুষজনের নামই এ রকম। পরিবার থেকেই এসব নাম দেওয়া হয়ে থাকে। এ কারণে সেখানে নিয়মিতই ‘মাঠে ছাগল চরাতে যান রাষ্ট্রপতি’; ‘প্রধানমন্ত্রী কোনো জিনিসপত্র কেনাবেচা করেন’। শুধু তাই নয়, ওই গ্রামের চিকিৎসকেরা ‘স্যামসাং’ বা ‘অ্যান্ড্রয়েড’ নামের রোগীদের জন্য ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ লিখে দেন।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজস্থানের বুন্দি জেলা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে রামনগর গ্রাম। এখানে কঞ্জর সম্প্রদায়ের বাস। জনসংখ্যা ৫০০। এই গ্রামে থাকেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, রাজ্যপাল, কালেক্টর, জিওনির নামের মানুষেরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রামনগর গ্রামে দেশের সর্বোচ্চ পদ, কার্যালয়, মোবাইল ব্র্যান্ড ও জনপ্রিয় যে কোনো জিনিসের নামে মানুষের নাম রাখা হয়। এ কারণে এখানে ভাইয়ের নাম ‘সিম কার্ড’ তো বোনের নাম ‘মিসড কল’। এ ছাড়া কারও নাম চিপ, স্যামসাং তো অন্য কারও নাম ‘অ্যান্ড্রয়েড’ বা ‘হাইকোর্ট’। এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ পড়ালেখা জানেন না।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একদিন ওই গ্রাম পরিদর্শনে আসেন জেলা প্রশাসক (কালেক্টর)। কালেক্টর শব্দটি এক নারীর ভালো লাগায় তিনি তাঁর নাতির নাম ‘কালেক্টর’ রাখেন। ‘কালেক্টর’ কখনো স্কুলে যাননি। এখন তাঁর বয়স ৫০ বছর।

গ্রামের সরকারি স্কুলের এক শিক্ষক বলেন, ‘এই গ্রামের কিছু মানুষ অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এ কারণে প্রায় সময় তাঁদের থানা কিংবা আদালতে যেতে হয়। গ্রামের বাইরে চকচকে জিনিসপত্র আর বড় বড় কর্মকর্তাদের দেখে তাঁরা মুগ্ধ হয়ে যান। পরে বাড়ি ফিরে তাঁরা ওই সব নামেই সন্তানদের নামকরণ করেন। যেমন কারও কারও নাম আইজি, এসপি, হাওলাদার ও ম্যাজিস্ট্রেট।’

গ্রামের আরেক ব্যক্তির নাম ‘কংগ্রেস’। তিনি ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভক্ত। আর এ কারণেই তাঁর পরিবারে সোনিয়া, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা নামের সদস্য আছে।

গ্রামের একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নাম ‘হাইকোর্ট’। বদমেজাজের কারণে গ্রামের সবাই তাঁকে চেনেন। তাঁর জন্মের সময় একটি মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পান দাদা। হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে ফিরেই তিনি নাতির ওই নাম রাখেন।

কঞ্জর ও মোগ্গিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন রামনগর গ্রাম ছাড়াও নাইনবা এলাকায় বাস করেন। এ অঞ্চলে নাম হিসেবে তাঁদের পছন্দ মোবাইল ব্র্যান্ড ও তার অন্যান্য উপকরণের নাম।

স্থানীয় সরকারি কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মী রমেশ চাঁদ রাঠৌর বলেন, ‘এ অঞ্চলের বরগনি, হনুমন্তপুরা, সুয়ালিয়া এবং সেসোলা গ্রামের অধিকাংশ মানুষের নাম নোকিয়া, স্যামসাং, সিম কার্ড, চিপ, জিওনি।’ তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী আরনিয়া গ্রামের মীনা সম্প্রদায়ের নারীদের পছন্দ মিষ্টি। তাই তাঁদের নামের তালিকায় আছে ফটোবাই, জিলাবি, মিঠাইর মতো নাম।

রমেশ চাঁদ রাঠৌর বলেন, ‘শুরুতে যখন এসব নামের মানুষ এখানে নাম নিবন্ধন করতে আসতেন তখন হতভম্ব হয়ে যেতাম। কিন্তু এখন এসব নাম লেখা অভ্যাস হয়ে গেছে। সম্প্রতি নতুন হিসেবে স্মার্টফোন ও অ্যান্ড্রয়েড নাম দুটি যুক্ত হয়েছে।’

টাইমনিউজবিডি.নেট/মাহমুদ