চার সন্তানের জননী ইয়াসমিন একজন রোহিঙ্গা নারী। তিনি খুব ভালো করেই জানেন তার পরিবারের বিপদ সম্পর্কে।

তাই মিয়ানমারের আরো অনেক রোহিঙ্গার মতো তিনিও অপেক্ষা করছেন সমুদ্র যাত্রার নতুন ‘মওসুমের’ জন্য। বাতাসের প্রবাহ কম থাকায় সমুদ্র তুলনামূলক শান্ত থাকে বলে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়কে মানবপাচারের জন্য বেছে নেয় পাচারকারীরা।

এটিই তাদের কাছে মওসুম হিসেবে পরিচিত। আর এ সময়ই জীবন বাঁচাতে নৌকায় আন্দামান সাগর পাড়ি দেয় রোহিঙ্গারা।

খুবই নিম্নমানের নৌকায় সাগর পাড়ি দেয়ার মতো দুঃসাহসিক কাজ করে তারা। নৌকা যদি সাগরে ডুবে নাও যায় তবু এই অনিশ্চিত পথের যাত্রীদের অনেকেই অনাহার, রোগব্যাধি কিংবা পাচারকারীদের নির্যাতনে মারা যায়।

যারা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে পৌঁছতে পারে তাদের জন্য সেখানেও ওঁত পেতে থাকে নতুন বিপদ। পাচারকারীরা মুক্তিপণের দাবিতে তাদের জঙ্গলের ক্যাম্পে বন্দী করে রাখে বা দাস শ্রমিক হিসেবে বিক্রি করে দেয়।

কিন্তু ‘রাষ্ট্রহীন’ এসব মুসলমান সংখ্যালঘুর কাছে বৌদ্ধপ্রধান মিয়ানমারের উদ্বাস্তু ক্যাম্পের জীবন আরো যন্ত্রণাদায়ক। সে কারণেই ইয়াসমিনের মতো মানুষেরা বেঁচে থাকার জন্য সমুদ্রযাত্রার ঝুঁকি নেয়।
নিজের পরিকল্পনা সম্পর্কে ইয়াসমিন বলেন, ‘এখানে আমি ও আমার সন্তানদের জন্য কিছুই নেই। তাই ঝুঁকি নিতে আমরা ভয় পাচ্ছি না। এখানে জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে বাঁচার চেষ্টা করতে দোষ কী’?

এত কিছু সত্ত্বেও গণতন্ত্রের পথে ধাবমান মিয়ানমারে এই বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। কোনো র‌্যালি, সমাবেশ কিংবা কোনো ধরনের প্রতিবাদ নেই। উল্টো এবারের নির্বাচনে কোনো মুসলমানকে প্রার্থিতা দেয়া হয়নি। নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্কের দোহাই দিয়ে বরং লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।

গতকালের নির্বাচনে রোহিঙ্গারা ভোট দিতে পারেনি। তবে নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্র বিন্দুতে ছিল এই রোহিঙ্গারাই। বিশেষ করে মুসলমানবিরোধী অনুভূতি জাগ্রত করতে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ ও ভিুরা রোহিঙ্গাবিরোধী তুমুল প্রচারণা চালিয়েছে।

দেশটির গণতন্ত্রপন্থী ও স্পষ্টভাষী নেতা হিসেবে পরিচিত বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সান সু কিও এই মানবিক ইস্যুটির ব্যাপারে আশ্চর্য নীরবতা পালন করছেন। উল্টো বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে নোবেল বিজয়ী সু কি রোহিঙ্গা ইস্যুতে ‘বাড়াবাড়ি’ না করার জন্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান। কয়েক দিন আগেই আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা রোহিঙ্গাদের অবস্থানকে গণহত্যার সম্ভাব্য প্রাথমিক পর্যায় বলে অভিহিত করেছেন।

সিত্বই শহরে উদ্বাস্তু শিবিরের বাসিন্দারা জানায়, এরই মধ্যে পাচারকারী চক্রের এজেন্টরা নতুন মওসুমে পাচারের জন্য লোক সংগ্রহ শুরু করেছে। তারা বিদেশে উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে এবং নতুন নৌকা তৈরি করছে।

সম্প্রতি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক রিপোর্টে এই সমুদ্র যাত্রার ভয়াবহতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। রিপোর্টে চলতি বছর কয়েক হাজার রোহিঙ্গা দেশ ছাড়তে গিয়ে সমুদ্রে প্রাণ হারিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সমুদ্র পড়ি দিয়ে ইন্দেনেশিয়ায় পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে এমন এক শ’রও বেশি রোহিঙ্গার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ওই রিপোর্টটি তৈরি করা হয়েছে।

২০১২ সালে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরে উগ্র বৌদ্ধদের হামলার পর এক লাখের বেশি লোক প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার ছেড়ে পালিয়েছে। যাদের বেশির ভাগই পালিয়েছে সমুদ্রপথে। জাতিসঙ্ঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাই কমিশনার এরই মধ্যে আসন্ন ‘মওসুমে’ ব্যাপক সংখ্যক লোকের মিয়ানমার ছেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

দ্য টেলিগ্রাফ অবলম্বনে

এমএ