পাঁচ বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে জর্জরিত সিরিয়ার আলেপ্পো শহরে উদ্ধার হওয়া যেই শিশুর ছবি সারা বিশ্বকে হতভম্ব করে দিয়েছে, সেই ওমরান দাকনিশের বড় ভাই মারা গেছে। আলী দাকনিশ নামে দশ বছর বয়সী শিশুটি বোমা হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিল।

আলেপ্পোর রাস্তায় সে দিন খেলা করছিল বছর দশেকের আলি। ওমরান দাকনিশের দাদা। হঠাৎই মূর্তিমান বিভীষিকার মতো আকাশ থেকে ধেয়ে এল মৃত্যুদূত। বোমারু বিমানের আঘাতে তখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত ছোট্ট আলির বাড়ি। কোনও রকমে প্রাণে বেঁচে যায় আলির পরিবার।

বছর চারেকের ওমরান-সহ তার মা-বাবা-বোনদের উদ্ধার করে বার আনা হয় ধ্বংসস্তূপ থেকে। অ্যাম্বুল্যান্সের কমলা রঙের সিটে বসা ওমরানের রক্তাক্ত অসহায় মুখ তখন ভেসে উঠেছে স্যোশাল মিডিয়ার দেওয়ালে। আলান কুর্দির পর যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় নতুন মুখ!

মানবাধিকার সংগঠন সিরিয়া সলিডারিটি ক্যাম্পেইন জানিয়েছে, রাশিয়ার বোমার আঘাতে দাকনিশ পরিবারের বাড়িটি বিধ্বস্ত হয়।

একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে রয়টার্স বলছে, ১৭ই আগস্ট ওই বোমা হামলার কারণে শরীরের ভেতরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ আলীর মৃত্যুর কারণ।

সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের দখলে থাকা এলাকাগুলোতে রাশিয়া এবং সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর যুদ্ধ বিমান থেকে ব্যাপকভাবে হামলা চালানো হচ্ছে। তবে ওমরান দাকনিশের বাড়িতে কোনও হামলার কথা অস্বীকার করেছে রাশিয়া।

এদিকে, রক্তস্নাত শিশু ওমরানের ছবি প্রকাশের পর তা অনেককেই স্মরণ করিয়ে দেয় শিশু আয়লানের কথা। সামাজিক মাধ্যমে ঝড় ওঠে সেই ছবিকে ঘিরে।

এছাড়া, ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, রক্তাক্ত, সারাগায়ে ধূলি মাখা ভীত শিশু ওমরান একটি অ্যাম্বুলেন্সের সিটে বসে রয়েছে, একটু পরেই সে নিজের মুখে হাত বুলিয়ে রক্ত দেখতে পেয়ে চমকে ওঠে।

এই ভিডিও আর ছবি প্রকাশ করে সিরিয়ার বিদ্রোহীরা । এখন এলো তার ভাইয়ের মৃত্যুর খবর।

সিরিয়ার একসময়কার শিল্প ও বাণিজ্য নগরী হিসেবে খ্যাত আলেপ্পোতে কয়েক সপ্তাহ ধরেই সিরিয়ান বিদ্রোহী আর সরকারি বাহিনীর মধ্যে লড়াই চলছে। সহিংসতায় কয়েকশ মানুষ নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিমান হামলায় প্রাণে বেঁচে যাওয়ার পর হতভম্ব ও রক্তাক্ত অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সের পেছনের আসনে বসে থাকা ৫ বছরের শিশু ওমরান দাকনিশযেন সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ আর আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে চলমান লড়াইয়ের ভয়াবহতার এক জলন্ত সাক্ষী। তুরস্ক উপকূলে ভেসে ওঠা সিরীয় শরণার্থী শিশু আয়লানের মতো ওমরানও যেন বিপন্ন মানবতার আরেক প্রতীক।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, বুধবার (১৭ আগস্ট) আলেপ্পো শহরে সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় পাঁচ শিশু আহত হয়। এদের মধ্যে ওমরানও একজন। বিমান হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও আহত হয় সে। ছবিতে দেখা যায়, ওমরানের মাথা থেকে হাঁটু পর্যন্ত ধূলোতে ভরে গেছে। হামলায় ওমরান এতটা স্তব্ধ হয়ে পড়েছে যে তার কপাল থেকে যে রক্ত ঝরছে সেদিকে তার খেয়ালই নেই।

একটি ভিডিও থেকে স্থির ছবিটি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে গার্ডিয়ান। ভিডিওটি মূলত ধারণ ও প্রচার করেছে সিরিয়ার সরকারবিরোধী গোষ্ঠী আলেপ্পো মিডিয়া সেন্টার। পরে তারা ইউটিউবে ভিডিও ক্লিপটি পোস্ট করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবিটি হাজার হাজার শেয়ার হয়েছে। টুইটারে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের প্রতিনিধি রাফ স্যানশেজ প্রথম ওমরানের ছবিটি পোস্ট করেন। পরে সেখানেও ১০ হাজার বার ছবিটি রিটুইট হয়েছে।

স্থানীয় এক চিকিৎসকের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের খবরে বলা হয়, ‘বুধবার পাঁচ শিশু ছাড়াও এক নারী ও দুই তরুণও ওই হামলায় আহত হয়েছেন। টেলিগ্রাফের খবরে আরও বলা হয়, এম টেন হাসপাতালে ওমরানকে তার মাথার আঘাতের কারণে চিকিৎসা দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বুধবার আরও ১২ শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই চিকিৎসক। তাদের প্রত্যেকের বয়স ১৫ বছরের নিচে।

এর আগে গত বছর, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচার আশায় ইউরোপে যাওয়ার জন্য মা-বাবা ও পাঁচ বছরের এক ভাইয়ের সঙ্গে নৌকায় পাড়ি জমিয়েছিল তিন বছর বয়সী শিশু আয়লান। কিন্তু তুরস্কের উপকূলে ডুবে যায় তাদের নৌকা। পরে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর উপকূলে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা অবস্থায় উদ্ধার হয় আয়লানের মরদেহ। সেসময় থেকে আয়লান হয়ে ওঠে বিপন্ন মানবতার প্রতীক।

কেবি