বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার আইনের শাসন একদিকে চরম হুমকির মুখে অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের অব্যাহত বিস্তার দেশটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছে। জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার না থাকায় মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার ভুলন্ঠিত। সরকার প্রধান শেখ হাসিনা কার্যত সকল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন। জনগণের কোনোভাবেই তার প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না। পরিস্থিতির উন্নয়নে দ্রুত নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠা জরুরী।
গতকাল বুধবার হাউস অব কমন্সের রুমে আয়োজিত বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার লংঘন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য জাতীয় সংলাপ শীর্ষক আন্তর্জাতিক কন্ফারেন্সে অংশ নিয়ে এমন অভিমত ব্যক্ত করেন বৃটিশ পার্লামেন্টের শীর্ষস্থানীয় এমপিরা, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও তরুণ প্রজন্ম ।
বাংলাদেশের চলমান সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে হাউস অব কমন্সের সেমিনারকক্ষে যৌথভাবে সেমিনারের আয়োজন করে ভয়েস ফর বাংলাদেশ ও বাংলাদেশী স্টুডেন্ট ইউনিয়ন ইউকে।
কন্ফারেন্সে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার।
সেমিনারে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপিগণ বলেন, বাংলাদেশে অগ্রহণযোগ্য সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে জঙ্গিবাদের উত্থান হচ্ছে। দেশে দীর্ঘদিন ধরে সুষ্ঠু নির্বাচনহীন শূন্যতার কারণে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশে এখনও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাংলাদেশে গণতন্ত্র এবং বাকস্বাধীনতা ধসে পড়েছে।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের লর্ড নাজির আহমেদ সভাপতিত্বে ও সাংবাদিক আতিউল্লাহ ফারুকের পরিচালনায় আন্তর্জাতিক কন্ফারেন্সে বক্তব্য রাখেন এ্যান্ডু সোয়াইনি এমপি, ইয়াসমিন কোরাইশী এমপি, হিউমেন রাইট ওয়াচে দক্ষিণ এশিয়ার ডিরেক্টর মিনাকসি গাঙ্গুলি, এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়ার ডিরেক্টর ওলঅফ বোল্মকুভিস্ট, শিক্ষাবিদ সৈয়দ মামুনুর রশিদ প্রমুখ।
এ ছাড়াও সাংবাদিক মাহবুব আলী খানশূর, সাংবাদিক মুহাম্মদ নূরে আলম, মানবাধিকার সংগঠক ফরিদুল ইসলাম, মানবাধিকার সংগঠক মনিরুল হক, সাংবাদিক এস এম মাহবুবুর রহমান, আলী শাহাজাদা, জাবেদ হোসেন, জামিল ভূইঁয়া, ভয়েস ফর বাংলাদেশের হাসনাত চৌধুরী ও আইনজীবি মো: ডলার বিশ্বাস, কামাল হোসেন, আফজাল হোসেন, শোয়েবুর রহমান লায়েক, জাকির হোসেন, রিয়াজুল হক প্রমুখ।
ব্রিটিশ এমপি লর্ড নাজির আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে যে কোনো সময় গৃহযুদ্ধ বেধে যেতে পারে। বাংলাদেশে সুশীল সমাজ চুপসে যাচ্ছে এবং সুশীল সমাজের জায়গায় স্থান করে নিচ্ছে জঙ্গিরা। ‘অতীতে মধ্যপন্থী মুসলিম দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশে ক্রমেই জঙ্গিরা শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সম্প্রতি ছুরি ও চাপাতির আঘাতে যাদের খুন করা হয়েছে তাদের হত্যার দায় স্বীকার করেছে আইএস জঙ্গি গোষ্ঠী। যদিও বাংলাদেশ সরকার এই হত্যাকান্ডে সঙ্গে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিদের সম্পৃক্ততা নাকচ করে দিয়েছে।’
সাংবাদিক আতিউল্লাহ ফারুক বলেন, দেশে প্রতিদিন মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটছে। চলছে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড। তিনি বলেন, জনগণের বাকস্বাধীনতা এবং সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা সরকার হরণ করেছে। সন্ত্রাসবাদকে সরকার প্রশয় দিচ্ছে উল্লেখ করে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে বৃটেনসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানান বৃটিশ এই শিক্ষাবিদ ।
হিউমেন রাইট ওয়াচে দক্ষিণ এশিয়ার ডিরেক্টর মিনাকসি গাঙ্গুলি বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে হলে রাজনীতিবিদদের মধ্যে অবশ্যই সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরস্পরের প্রতি আস্থা নেই। তিনি বলেন, একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত না হলে বিশ্ব সম্প্রদায় থেকে বাংলাদেশ ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার বিরোধীদের কে সরকারি দল জঙ্গী রাজাকার বলে ধরে নিয়ে হত্যা করা হচ্ছে । বিরোধী জোটের নেতা কর্মীদের মোটা অংকের টাকা দাবি করে আইন শঙ্খলা বাহিনী না দিলে হাতে পায়ে গুলি করে হাজার হাজার মানুষকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
ক্রসফায়ার বন্ধের আহ্বান জানিয়ে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়ার ডিরেক্টর ওলঅফ বোল্মকুভিস্ট বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। সন্ত্রাসী হামলার সঠিক তদন্ত না হওয়ায় দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান দেখা দিচ্ছে ।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি মর্মে এরই মধ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ও হয়েছিল। অবিলম্বে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনায় বসতে হবে।
উপস্থিত তরুণ প্রজন্ম বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে আলোচকদের উদ্দেশ্যে বলেন, বর্তমান অনির্বাচিত সরকার সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে তা না হলে আটক জঙ্গীদের ক্রসফায়ার করছে। বিরোধীদলে থাকাকালীন শেখ হাসিনা বাংলাদেশ তালেবান ও জঙ্গিবাদের আখড়া বলে বহিবিশ্ব প্রচারণা চালিয়েছেন। অথচ তার সরকারের সময় জঙ্গিবাদের বিস্তৃতি ঘটলে সন্ত্রাসী নানা কর্মকান্ডের জন্য বিরোধী দলের উপর দোষ চাপিয়ে এসব 'পশ্চিমাদের আবিষ্কার' বলেও মন্তব্য করেছেন। অবৈধ ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার জন্য শেখ হাসিনা জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদকে উপলক্ষ্য হিসাবে ব্যবহার করছেন, যা বিশ্ববাসীর কাছে অত্যন্ত পরিষ্কার। বাংলাদেশকে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পথে ফেরাতে দেশটির উন্নয়নের বৃহত্তম অংশীদার গ্রেট বৃটেনকে আরো জোরাল ও কার্যকর ভূমিকা রাখার দাবি করে । গুম খুন ক্রসফায়ার বন্ধের দাবি করা হয়।
জেড





