স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা সম্বলিত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল’কে কেন্দ্র করে কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেফতার করার পর তাদেরকে আটক রাখতে জায়গার সমস্যায় পড়েছে ভারতীয় প্রশাসন।

সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভাড়া নেয়া হচ্ছে যাতে আটক ব্যক্তিদের সেখানে রাখা যায়। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সূত্র উদ্ধৃত করে শুক্রবার (১৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় ‘আজতক’হিন্দি টিভি চ্যানেল ওই তথ্য দিয়েছে। 

ভারতের কেন্দ্রীয় নরেন্দ্র মোদি সরকার জমু-কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা বাতিল করার পরে সেরাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি, ওমর আবদুল্লাহর মতো সাবেক মুখ্যমন্ত্রীদের পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে।

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও ন্যাশনাল  কনফারেন্সের প্রধান ডা. ফারুক আব্দুল্লাহসহ অনেক রাজনৈতিক নেতাকে গৃহবন্দি অথবা আটক করা হয়েছে। অতীতে যারা পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় জড়িত ছিল তাদেরকেও পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

উপত্যকার পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায় সে জন্য ওই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু ঠিক কত লোককে আটক রাখা হয়েছে তা ভারতীয় প্রশাসন ও পুলিশ তা প্রকাশ্যে আনছে না।

যদিও এই সংখ্যা খুব বেশি হওয়ার কারণে বেসরকারি স্থানকে ডিটেনশন সেন্টার হিসেবে ভাড়া নিতে হচ্ছে। এর মধ্যে গেস্ট হাউস, ছোট হোটেল ও আবাসিক সম্পত্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এরআগে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বন্দিকে বিজেপিশাসিত উত্তর প্রদেশের আগ্রা ও বেরেলি কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদের মধ্যে ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আলী মুহাম্মাদ সাগর, কাশ্মির হাইকোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি মিয়াঁ কাইয়ুম ও কাশ্মির চেম্বার অব কমার্সের কর্মকর্তা মুবীন শাহও রয়েছেন।

বিক্ষোভের আশঙ্কায় ব্যাপক ধরপাকড়ের ফলে সেখানকার কারাগারগুলোতে জায়গা না থাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিকল্প উপায়ের কথা ভাবা হয়েছে।

আরও পড়ুন: কাশ্মির নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে রুদ্ধদ্বার বৈঠক 

সম্প্রতি জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের অতিরিক্ত মহা-পরিচালক (এডিজিপি) মুনির খান  বলেন, জননিরাপত্তা আইন (পিএসএ) এর আওতায় কিছু লোককে আটক করা হয়েছে, যার মাধ্যমে উপত্যকার সন্দেহভাজনদের কয়েক বছর কারাগারে রাখা যায়। পেলেটগানের আঘাতে কিছু লোক আহত হয়েছে এবং কিছু এলাকায় পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।

এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘পিএসএ’র আওতায় কয়েকটি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে।  কারও প্রাণহানি হোক আমরা তা চাই না বলেও পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজিপি) মুনির খান মন্তব্য করেন।

উল্লেখ্য, গত ৫ আগস্ট ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা সম্বলিত সংবিধানের ৩৭০ ধারা ও ৩৫ ধারা বাতিল করে গোটা কাশ্মীরকে একতরফাভাবে দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করে ভারতের উগ্র-হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার।

এরপর থেকেই ১৪৪ ধারা জারি করে ভারত সরকার। তবে ধারা বাতিলের একদিন পর থেকেই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ করেছে কাশ্মীরিরা। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে অনেকেই নিহত হয়েছে। কিন্তু ভারত সবসময়ই বিক্ষোভের কথা অশিকার করে আসছে। এর ফলে কাশ্মিরে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয় এবং সম্ভাব্য গোলযোগ প্রতিহত করতে সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন করা হয়।

ভারত সরকার জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিলে তীব্র প্রতিবাদ জানায় পাকিস্তান। ভারতের পদক্ষেপের কারণে ওই অঞ্চলে উদ্ভূত সংকটের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে জরুরি বৈঠকে বসার আহ্বান জানায় পাকিস্তান। কাশ্মীর প্রশ্নে ভারতের পদক্ষেপকে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে অভিহিত করা হয়েছে।

চীনও পাকিস্তানের পক্ষে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে বৃহস্পতি বা শুক্রবার কাশ্মীর নিয়ে বৈঠকে বসার আহ্বান জানায়। এরফলে জম্মু-কাশ্মীরের চলমান সংকট নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক ডেকেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (ইউএনএসসি)। শুক্রবার (১৬ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় কাশ্মীর সংকট নিয়ে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে।

কাশ্মিরের বিশেষ ক্ষমতা বাতিলের ফলে এখন হিন্দু অভিবাসীরা কাশ্মিরের জমি কিনে সেখানে বসবাস করতে পারবেন। বিশেষ ক্ষমতার কারণে জম্মু-কাশ্মিরের স্থায়ী অধিবাসী নন এমন কারো পক্ষে সেখানকার জমি কেনা সম্ভব ছিল না।

ভারত সরকার কয়েক দশক ধরে নিজের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে লাখ লাখ সেনা মোতায়েন করে রেখেছে। কাশ্মিরের জনগণ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাশ্মির সংক্রান্ত প্রস্তাবের বাস্তবায়ন চান যেখানে এই অঞ্চলের ভবিষ্যত নির্ধারণের বিষয়টি সেখানকার জনগণের মধ্যে গণভোট আয়োজনের মাধ্যমে মীমাংসা করার কথা বলা হয়েছে। ভারত সরকার অবশ্য নিরাপত্তা পরিষদের এই প্রস্তাব মেনে নিতে অস্বীকার করেছে।

এমবি