মিয়ানমারের আরাকান তথা রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের পুরোপুরি উচ্ছেদ করে সেখানে একক বৌদ্ধ রাষ্ট্র (Pure Buddhist State) প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত করা হচ্ছে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি জার্মানির কোলন (Cologne) শহরে তুরস্কভিত্তিক চ্যারিটেবল সংগঠন হাসিন ইন্টারন্যাশনালের (Hasene International) উদ্যোগে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্লেষকরা এমন মন্তব্য করেছেন।

চলতি (মে) মাসের ২-৩ তারিখ অনুষ্ঠিত ”রোহিঙ্গা সংকট ও সমাধান“ (Rohingya Crisis and Solution)- শীর্ষক  অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে রোহিঙ্গা গণহত্যা ও জাতিগত নিধনযজ্ঞ সম্পর্কে জাতিসংঘসহ বিশ্ব নেতাদের কার্যত নিস্ক্রিয় ভূমিকারও সমালোচনা করা হয়।

সম্মেলনের এক সেসনের প্রধান বক্তা (Keynote Speaker) মালয়েশিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী  সাইয়েদ হামিদ আলবার (Syed Hamid Albar) বলেন, রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ জন্মভূমি থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে। একটি একক বৌদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এমনটি করা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

গণহত্যা ও জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানোর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদের রাখাইন থেকে তাড়িয়ে দেয়া এবং একক বৌদ্ধ রাষ্ট্র নির্মানের নীতি বন্ধে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগে বিশ্ব নিয়ন্ত্রকদের ব্যর্থতারও সমালোচনা করেন মালয়েশিয়ার এই সাবেক মন্ত্রী।

সম্মেলনের বাইরে তুরস্কের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম আনাদুলু সংস্থাকে (Anadolu Agency) দেয়া একান্ত সাক্ষাতের সময়ও এমন মন্তব্য করেন মালয়েশিয়ার এই সাবেক মন্ত্রী। এ সময় তিনি আরো বলেন, মিয়ানমার জানে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিধর অনেক দেশ তার সুরক্ষায় রয়েছে।

এই সাবেক মন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেন, এত কিছুর পরও মিয়ানমার সরকার বা সেনাদের কিছুই হয়নি। এমনই এক পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যে মিয়ানমার মনে করছে তারা সব কিছুর উর্ধ্বে, তাদের কোনো জবাবদিহিতা করতে হবে না। এখন একক বৌদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তারা যা খুশি তাই করতে পারেন।  

দুই দিনের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫শ প্রতিনিধি অংশ নেন। সম্মেলনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ রোহিঙ্গাদের মৌলিক ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন দেশে কর্মরত নানা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্লেষকরা, রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় পরিচয়কে বড় করে না দেখে তাদেরকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করার জন্য বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আহবান জানান।

এই সংকটের সমাধান না হলে তা যে শুধু মিয়ানমার বা বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে তা নয়; বরং এই সংকট বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যাবে বলেও সতর্ক করেন আলোচকরা।

তারা বলেন, একটি দেশ ছেড়ে যখন লাখ লাখ মানুষ বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন, তখন আর সেটি কোনো দেশের অভ্যন্তরীন বিষয় হতে পারে না, এটি পুরোপুরি একটি আন্তর্জাতিক বিষয়। তাই জাতিসংঘসহ সবাইকে এ বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে।

মিয়ানমার সরকার যে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তার সুষ্ঠু বিচার হওয়া দরকার বলেও মত দেন বিশ্লেষকরা। এটা না হলে অপরাধ করে পার পাওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হবে তা পুরো বিশ্বব্যবস্থার জন্যই হুমকি হয়ে দেখা দিবে।  

উল্লেখ্য, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দেয়া হিসেব মতে, ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সামরিক আগ্রাসন শুরুর পর যাবত প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। এদের মধ্যে বড় একটি অংশই শিশু, নারী ও বৃদ্ধ। কক্সবাজার ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন এই উদ্বাস্তুরা।

চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (Doctors Without Borders)- এর দেয়া তথ্য মতে, ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট থেকে ২৪শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধুমাত্র একমাসেই অন্তত ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবিক সংগঠন (Global Humanitarian Organization) এর পক্ষ থেকে গত ১২ই ডিসেম্বর (২০১৭) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিহতদের মধ্যে ৭১.৭ শতাংশ বা ৬,৭০০ জনই সহিংশতায় নিহত হন। এর মধ্যে ৭৩০জন শিশু যাদের বয়স ৫ বছরের নিচে।

সম্মেলনে অংশ নেয়া বিশ্লেষকরা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দলের কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন ও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের আশ্বাসকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন।

তবে, প্রতিনিধি দলটি মিয়ান সফরে গিয়ে গণহত্যা ও অন্যান্য অপরাধের তদন্ত করতে মিয়ানমার সরকারকে সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেয়াকে হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেন।

তারা প্রশ্ন করেন, যেখানে মিয়ানমার নিজেই অপরাধ সংগঠন করেছে এবং বিবাদীর কাঠগড়ায় সেখানে মিয়ানমারই আবার কিভাবে তদন্ত করবে, আর জাতিসংঘই বা সেখানে কিভাবে সাহায্য করতে পারে?

এদিকে, জাতিসংঘের দেয়া তথ্যেও  রাখাইনে হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, অমানবিক শারিরীক নির্যাতন ও গুমের মতো অপরাধের কথা বলা হয়েছে। সংস্থাটি এসব অপরাধকে মানবতাবিরোধী অপরাধ (Crimes Against Humanity) হিসেবেও আখ্যায়িত করেছে।  

বিশ্লেষকরা রোহিঙ্গাদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া সাপেক্ষে নিজ দেশ আরাকানে প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে সেজন্য সংগঠিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের আন্তর্জাতিক সংস্থার অধীনে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচার হওয়া জরুরী।

কেবি